অনিয়মের জালে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেল: সানাউল-সলিম সিন্ডিকেটে জিম্মি গ্রাহক

ঘুষ দিলেই মিলছে লাইসেন্স ও ফিটনেস, সেবার অদৃশ্য রেটকার্ড

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:০৯

বাধ্যতামূলক সরকারি ফি অনলাইনে জমা দিয়েও বিআরটিএ কার্যালয়ে বছরের পর বছর মিলছে না সনদ। অথচ নির্ধারিত ফি-র বাইরে মোটা অঙ্কের অর্থ পৌঁছে দিলেই কোনো লিখিত বা ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই মিলছে ড্রাইভিং লাইসেন্স। পরীক্ষা ছাড়াই ছাড়পত্র পাচ্ছে ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের (বায়েজিদ বালুচরা) কার্যালয়টি এখন ঘুষ বাণিজ্য, নজিরবিহীন দুর্নীতি ও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির এক সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ অনলাইনে ফি পরিশোধ ও স্বচ্ছতার নির্দেশনা জারি করলেও এই কার্যালয়ে তা সম্পূর্ণ অকার্যকর।

‎সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২০২৩ সালের ২৩ মে বিআরটিএ কেন্দ্রীয় কার্যালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা দেয়, ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করলেই সেবা পাওয়া যাবে। এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ঘুষ ও দালাল নির্ভরতা বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

কিন্তু চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। টাকা জমা দিয়ে গ্রাহক ফাইল জমা দিলেও সেই ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকে।

যদি ‘সেটেল’ না হয়, অর্থাৎ দালাল সিন্ডিকেটের অনুমোদন না থাকে তবে কোনো ফাইলই কার্যকর হয় না। অথচ দালালের হাত ঘুরে আসা ‘বিশেষ চিহ্নিত’ ফাইল মুহূর্তেই নিষ্পত্তি পায়।

সূত্র বলছে, অফিসের ভেতরে কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরে সক্রিয় বহিরাগত দালালদের যোগসাজশে এক শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। এই চক্রটি ডিজিটাল সেবা প্রাপ্তির স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে গ্রাহকদের থেকে ঘুষ আদায়ে বাধ্য করছে।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তির ভাষ্যে ফুটে উঠেছে এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের মূল নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হক এবং জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহর নেতৃত্বাধীন চক্রের হাতে।

অভিযুক্তদের দেয়া তথ্যমতে উপ-পরিচালক সানাউল হকের প্রশাসনিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তাঁর জন্য নতুন নয়। পূর্বে বিআরটিএ সিলেট ও ঢাকার মিরপুর কার্যালয়ে থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ ওঠে।

বিশেষ করে ২০২২ সালে সিলেটে তাঁর প্রশ্রয়ে পরিচালিত দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রতিবাদে ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ ধর্মঘটের ডাক দিলে পুরো অঞ্চল স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

জনদুর্ভোগ ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে তৎকালীন সময়ে তাঁকে সিলেট থেকে তড়িঘড়ি প্রত্যাহার করা হলেও, চট্টগ্রামে এসে তিনি আরও বেশি জাঁকিয়ে বসেছেন।

এই সিন্ডিকেটের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকিতে রয়েছেন জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহ। শক্তিশালী এ সিন্ডিকেটে ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্যে নাম উঠে এসেছে সহকারী মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল মতিন, জেলা রেজিস্ট্রেশন শাখার টিপু সুলতানের নাম।

তাঁদের পেছনে ছায়াসঙ্গী হিসেবে প্রশাসনিক ক্ষমতা চর্চা করছে কতিপয় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী এবং বহিরাগত ব্যক্তি। সিন্ডিকেটে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের অফিস সহকারী পিয়ন খোরশেদ আলমের অবস্থানও শক্ত। এছাড়াও কার্যালয়ের নৈশপ্রহরী লিটন ও বহিরাগত ক্যাশিয়ার রুবেলের প্রভাব লক্ষণীয়।

বিআরটিএর অস্থায়ী কর্মী হয়েও লিটন নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানা পরিবর্তন সেকশনে কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মতো গুরুতর জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনিয়মের বিষয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশাসনিক প্রতারণা ও ‘অদৃশ্য রেটকার্ড’

২০২৩ সালের মে মাসে বিআরটিএ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করলেই সেবা সুনিশ্চিত হবে। তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসে বাস্তব চিত্র উল্টো।

নিয়ম অনুযায়ী চালকেরা ফি জমা দিয়ে ফাইল জমা দিলে তা দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। ‘চুক্তি’ না হলে কিংবা দালাল চক্রের ‘বিশেষ সংকেত’ না থাকলে সাধারণ গ্রাহকের ফাইল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরিয়ে ফেলে কৃত্রিম জটিলতা তৈরির অভিযোগও সাধারণ ঘটনা।

পরিবহন সংগঠন ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সার্কেলে প্রতিটি সেবার বিপরীতে প্রকাশ্যে চলছে একটি ‘অদৃশ্য রেটকার্ড’। যেমন-

ড্রাইভিং লাইসেন্স: পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স পেতে সিন্ডিকেটকে দিতে হয় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। সাধারণ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলেও অতিরিক্ত গুনতে হয় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।

বাসের রুট পারমিট ও ফিটনেস: আকার ও রূপান্তরভেদে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা।
হিউম্যান হলার ও লেগুনা: ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।
ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক: ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
সিএনজি অটোরিকশা: ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
অন্যান্য: নম্বরপ্লেট সংগ্রহ, গাড়ির মালিকানা বদল ও শারীরিক পরিদর্শন ছাড়াই মোটরবাইক রেজিস্ট্রেশনে নির্ধারিত ফি-র অতিরিক্ত অর্থ বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্টো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক সানাউল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপবার্তায় সংবাদ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্ন পাঠালেও এ রিপোর্ট প্রকাশের আগ পর্যন্ত কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পরবর্তীতে তিনি কোন বক্তব্য দিলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

ঠিক একইভাবে রাজস্ব কর্মকর্তা সলিম উল্যাহর হোয়াটসঅ্যাপবার্তায় সংবাদ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্ন পাঠালেও কোন উত্তর মেলেনি।

আইনের লঙ্ঘন ও চরম নিরাপত্তার ঝুঁকি

পেনাল কোড (দণ্ডবিধি)-এর ১৬১/১৬২ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী সরকারি পদে বহাল থেকে অসদুপায়ে অর্থ গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য মারাত্মক অপরাধ। তা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম চলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া বিষয় হলো-সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর উদ্দেশ্যকে পুরোপুরি ভেস্তে দিচ্ছে এই অনিয়ম।

বিআরটিএ যেখানে সড়কে দক্ষ চালক ও নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেখানে পরীক্ষা ছাড়া সনদ বিক্রি করে তারা সরাসরি অদক্ষ চালক ও যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত গাড়িকে রাস্তায় নামার বৈধতা দিচ্ছে।

অক্সিজেন এলাকার লেগুনা চালক মহিদুল ও অলংকারের সিএনজি চালক স্বপনসহ একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে বৈধ উপায়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। অথচ দালালকে মোটা অঙ্কের টাকা দিলে আধঘণ্টার মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। এটি সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের সাথে চরম অবিচার।

ফৌজদারি তদন্ত ও কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ

দুদক একাধিকবার বিআরটিএকে দুর্নীতির অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলেও কেবল বাহ্যিক দালাল ধরে এই ব্যাধি নিরাময় সম্ভব হয়নি। ভেতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রক্ষাকবচ থাকায় মূল অপরাধীরা সব সময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

প্রশাসনিক দুর্নীতি ও ফৌজদারি অপরাধের এই যুগলবন্দি থেকে চট্টগ্রাম বিআরটিএ-কে মুক্ত করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রত্যক্ষ সদিচ্ছা জরুরি।

অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি