দেশের কৃষি খাতের মূল চালিকাশক্তি রাসায়নিক সার। দেশের মাঠের ফসলের সুরক্ষায় যে সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কথা, তা রহস্যজনকভাবে পথ বদলে চলে যাচ্ছে সীমান্তপারে!
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার পাচারের এক আশঙ্কাজনক চিত্র আবারও সামনে এসেছে। গভীর রাতে কোস্ট গার্ডের সাহসিক অভিযানে ভেস্তে গেছে ৬০০ বস্তা ইউরিয়া সারের এক বিশাল পাচার পরিকল্পনা।
বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা। সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটসংলগ্ন সুনসান এলাকায় হঠাৎ ভেসে আসে ট্রাকার ইঞ্জিনের শব্দ।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আগেই ওত পেতে ছিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। পাচারকারীরা যখন ৩০ হাজার কেজি (৬০০ বস্তা) ইউরিয়া সার ট্রাকে তুলে মিয়ানমারে পাঠানোর জন্য ঘাট এলাকায় মজুদ করছিল, ঠিক তখনই হানা দেয় কোস্ট গার্ডের একটি চৌকস দল।
অভিযানে আনুমানিক ২১ লাখ টাকা মূল্যের এই সারের বিশাল চালানের পাশাপাশি পাচারকাজে ব্যবহৃত দুটি ট্রাক জব্দ করা হয়। হাতেনাতে আটক করা হয় পাচারচক্রের দুই সদস্যকে।
বারবার একই রুট: কাকতালীয় নাকি সুপরিকল্পিত?
উপকূলীয় সীতাকুণ্ডের এই বাঁশবাড়িয়া ঘাট এলাকাটি কি তবে পাচারকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে? এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। কারণ, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়।
এর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ১০ সেপ্টেম্বর একই বাঁশবাড়িয়া ঘাট এলাকা থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় তিনটি ট্রাকে থাকা ৩৫ হাজার কেজি (৭০০ বস্তা) ইউরিয়া সার জব্দ করেছিল কোস্ট গার্ড। সে সময় ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের সারসহ তিনটি ট্রাক ও দুই পাচারকারীকে আটক করা হয়।
স্বল্প ব্যবধানে একই ঘাট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সারের চালান পাচারের চেষ্টা প্রমাণ করে-উপকূলীয় এই পয়েন্টটিকে চোরাচালান চক্র তাদের মূল ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
দেশীয় বাজার ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান
দেশের বাজারে যখন কৃষকদের জন্য সার সুষম বণ্টনের তাগিদ থাকে, ঠিক তখন কোটি টাকার সার এভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা দেশের কৃত্রিম সার সংকটের শঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে সারের চড়া দাম এবং প্রতিবেশী দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র রাতারাতি বিপুল অর্থ উপার্জনের লোভে এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আটক ব্যক্তি, জব্দকৃত ট্রাক এবং সারের বিষয়ে আইনানুগ পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় চোরাচালানবিরোধী এ ধরনের কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।
নেপথ্যের কারিগররা কোথায়?
মাঠপর্যায়ে চালক ও সহযোগীরা ধরা পড়লেও এই পাচারচক্রের নেপথ্যে থাকা মূল নির্দেশদাতা বা প্রভাবশালী মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ড উপকূলকে পাচারমুক্ত করতে হলে শুধু টহল জোরদার করাই যথেষ্ট নয়, বরং সারের ডিলারশিপ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে থাকা কালো হাতগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে কোস্ট গার্ডের এই ধারাবাহিক সফল অভিযান যেমন পাচারকারীদের জন্য বড় সতর্কবার্তা, তেমনি দেশের সম্পদ রক্ষায় উপকূলীয় প্রহরা আরও জোরদার করার তাগিদ নির্দেশ করে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


