চট্টগ্রাম এলএ শাখার অলিখিত সম্রাট সার্ভেয়ার দেলোয়ার: কমিশন বাণিজ্যে কোটি টাকার সাম্রাজ্য!

নথি সোজা হলেও লাগে ১৫%, জটিলতায় ৪০%

নুর মোহাম্মদ রানা: প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:২৫

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জমি হারিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় ঘুরছেন পটিয়ার ভিটা হারানো এক দিনমজুর।

কাগজপত্র সব ঠিকঠাক, কোনো আইনি জটিলতা নেই-তবু মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে তাকে। কারণ একটাই, এলএ শাখার অলিখিত শর্ত, ক্ষতিপূরণের মোট টাকার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দিতে হবে ‘কমিশন’।

অন্যথায় কোনো না কোনো অজুহাতে আটকে থাকবে ফাইল, বন্ধ থাকবে চেক। আর যদি নথিতে সামান্যতম কোনো অসংগতি বা জটিলতা পাওয়া যায়, তবে সেই দাবির হার একলাফে উঠে যায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় দিনের পর দিন রূপ নিয়েছে এক চিরচেনা প্রাতিষ্ঠানিক সমীকরণে।

অনুসন্ধানকালে অভিযোগ উঠে, এই শাখার অঘোষিত কমিশন বাণিজ্যের মূল হোতা হিসেবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সার্ভেয়ার মো. আবু ইউসুফ ইফতেখার ওরফে দিপু।

দুর্নীতির নানাবিধ অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি করা হলেও অলৌকিক ক্ষমতার বলে বেশ কয়েকমাস ফাইল আটকে রেখে অনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি।

অবশেষে তিনি জেলা ছাড়তে বাধ্য হলেও এলএ শাখার এই সিন্ডিকেট সংস্কৃতির কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। দিপুর স্থান দখল করে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সার্ভেয়ার মো. দেলোয়ার হোসেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে পটিয়ার গৈরালা, নাইখান ও জঙ্গলখাইন মৌজায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে তদারকির দায়িত্বে ছিলেন দেলোয়ার। সেখানে নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক জোন এবং কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের চেক সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের দায়িত্বও রয়েছে দেলোয়ারের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের হাতে।

নিয়ম অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের পর জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণের আবেদনের পর নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব পড়ে সার্ভেয়ারের ওপর। আর এই আইনি এখতিয়ারকেই হাতিয়ার বানিয়েছে অসাধু চক্রটি।

নথিপত্রে কোনো ত্রুটি না থাকলেও সময়ক্ষেপণের ভয় দেখিয়ে এবং দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে ভূমিমালিকদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায় করা হচ্ছে। আর সমস্যা তৈরি করে দিতে পারলে সেই কমিশনের হার দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে।

কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্পের ভুক্তভোগী দুই ভাইয়ের গল্পটি এই জিম্মিদশার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আংশিক জমি অধিগ্রহণের পর চেকে স্বাক্ষর পেতে দেলোয়ার সিন্ডিকেটের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, একই জমির ক্ষতিপূরণ দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার নামে এক ভাইকে ৩০ শতাংশ কমিশনের টোপ দেওয়া হলে, অন্য ভাইয়ের কাছে কমিশনের হার আরও বাড়িয়ে দেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা।ভূমি

এ অন্যায় অবিচারের জিম্মি দশায় থেকে নিরবে চোখের জল ফেললেও আইনি জটিলতা এবং ক্ষতিপূরণের টাকা চিরতরে আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা আদেশে (স্মারক: ০৫.৪২.২০০০.০০০.০৩১.০২.০০০১.২৪.২২৯) সার্ভেয়ার মো. আবু ইউসুফ ইফতেখারসহ তিনজনকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে গত ১৫ এপ্রিল জারি করা প্রশাসনিক এই আদেশের পরও প্রভাব খাটিয়ে কয়েক মাস বহাল তবিয়তে ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সরে যেতে বাধ্য হলেও পর্দার আড়াল থেকে পুরো ফাইল নিয়ন্ত্রণের সুতা রয়ে গেছে পুরোনো সিন্ডিকেটের হাতেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলএ শাখার একাধিক কর্মচারী জানান, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে বর্তমানে বেশিরভাগ লাভজনক ও বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সার্ভেয়ার দেলোয়ারকে।

কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ারের এই সখ্যতার সুযোগেই মূলত কমিশন বাণিজ্যের অঘোষিত ‘রেটচার্ট’ কার্যকর রয়েছে। পটিয়া ও কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্প থেকেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এলএ শাখার অভ্যন্তরীণ সূত্রেও এখন খোলাসা।

কক্সবাজারে বিলাসবহুল বাড়ি, খাতুনগঞ্জে কোটি টাকার বিনিয়োগ

গত তিন বছরে এই কমিশন বাণিজ্যের বদৌলতে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন দেলোয়ার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজের জন্মস্থান কক্সবাজারে তৈরি করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি।

এছাড়া চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ ও আছাদগঞ্জে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা দাদন (বিনিয়োগ) দিয়ে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আয় সুগম করে রেখেছেন তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সার্ভেয়ার মো. দেলোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

তথ্য অধিকার আইনে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তাগুলোরও কোনো জবাব দেননি।

পরবর্তীতে বিষয়টির সত্যতা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলও)র মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে উদ্ধতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন (২০১৭) অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্তদের নাগরিক ও আইনি অধিকার।

প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে কমিশন আদায় করা প্রশাসনিক অপরাধ ছাড়াও দণ্ডবিধির অধীন মারাত্মক দুর্নীতির শামিল। উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এই শিকড়সম সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।

আইনি দিক: ২০১৭ সালের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতার সাথে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। অনৈতিক দেরি করানো বা কমিশন দাবি করা Prevention of Corruption Act, 1947 এবং Penal Code, 1860-এর ধারা ১৬১/১৬২ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তৃতীয় পর্বের আগাম টিজার প্রতিবেদন
অনিয়মের বেড়াজালে অঢেল সম্পদ: দুদক কি সত্যিই খুলবে এলএ শাখার ফাইল?

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা যেন এক অদম্য সিন্ডিকেটের আখড়া। দিপু কিংবা দেলোয়ার-চরিত্র বদলালেও বদলায়নি ভূমিমালিকদের দুর্ভোগের চিত্র। একের পর এক অনুসন্ধানে উন্মোচিত হচ্ছে এই চক্রের ক্ষমতার গভীরতা ও অর্জিত অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের পেছনে শুধুই কি কয়েকজন সার্ভেয়ার, নাকি পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন আরও বড় কোনো শক্তি?

অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে উঠে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভূমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা তছরুপ ও কমিশনের ভাগ বাটোয়ারায় জড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনের ভেতরের এক প্রভাবশালী বলয়।

অনুসন্ধানী দলের হাতে এসেছে এমন কিছু নথি ও কথোপকথোনের তথ্য, যা প্রমাণ করে এই অবৈধ সাম্রাজ্যের পরিধি শুধুই সার্ভেয়ারের টেবিলে সীমাবদ্ধ নয়।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: কার ছত্রছায়ায় বেপরোয়া এই সিন্ডিকেট? অমিত, রাজীব নাকি সিরাজ-কার ইঙ্গিতে চলে এলএ শাখার গোপন নথি লেনদেন?

দুদকের নিষ্ক্রিয়তা নাকি অদৃশ্য চাপ? কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও খাতুনগঞ্জের গোপন বিনিয়োগের তথ্য প্রমাণ থাকার পরও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে কীভাবে?

প্রশাসনিক ব্যবস্থার নামে শুধুই কি বদলি নাটক?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি