চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট থানা এলাকার পশ্চিম মাদারবাড়ি, শুভপুর রেলবিট, টং ফকির মাজার এবং কর্ণফুলী নদীর নানা ঘাট ঘিরে অপরাধের এক বিশাল জাল ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিদিনের প্রকাশ্যে চলা ইয়াবা-গাঁজা বিক্রি!র ছক, সড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে নিয়মিত চাঁদাবাজি এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকাটি।
তবে স্থানীয় অধিবাসী ও ভুক্তভোগীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ-আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় চলছে এসব অপকর্ম।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সদরঘাট থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই শাহাদাত হোসেনকে কেন্দ্র করে গঠিত একটি চক্র এই পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে।
অধস্তন সদস্য ও বিতর্কিত ‘ক্যাশিয়ার’দের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান এবং অপরাধীদের আড়াল করার যে কৌশল গড়ে উঠেছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
একাধিক সূত্রের অভিযোগ, পশ্চিম মাদারবাড়ির রশিদ মাস্টার বাড়ির পাশের রেলবিট এলাকায় মাদক বিক্রেতা জসিম উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেকেন্ড অফিসার এসআই শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে জসিমের প্রত্যক্ষ সখ্যের কারণে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে শক্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয় না।
এমনকি গত ২৬ মার্চ টং ফকির মাজার এলাকা থেকে ৫ হাজার ইয়াবাসহ জসিমকে এসআই হিরক সিং আটক করলেও, মামলা দুর্বল করে তাঁকে জামিনে বের করে আনার অভিযোগ ওঠে থানার অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে।
একই এলাকায় ফারুক নামে আরেক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন টং ফকির মাজারসংলগ্ন স্পটে ‘পাবনা’ নামের এক সহযোগীর মাধ্যমে রাতে চলে অবাধ মাদক কেনাবেচা। তবে ফারুকের দাবি, তিনি কেবল পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং নিয়মিত যাতায়াতকারী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁর শুধুই “পরিচয়” রয়েছে।
শুভপুর রেলবিটের কাছে ভাঙা ইটের আড়ালে কাজ করেন এয়াকুব ডন। নামমাত্র শ্রমিক পরিচয়ের আড়ালে সেখানে ইয়াবা বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন স্বয়ং এয়াকুবও। পাশেই আরিফের টং দোকানে চলে মাদক সেবন ও বিক্রির নিয়মিত আসর।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-যেসব স্থানে সর্বক্ষণ মোবাইল টিমের গাড়ি কিংবা টহল পুলিশ থাকে, সেখান থেকেই কয়েক গজ দূরে কীভাবে বছরের পর বছর এসব আসর জমে ওঠে?
সড়কে ট্রাকপ্রতি ১৫০ ও ‘ক্যাশিয়ার’ মিন্টুর ঘাট-বাণিজ্য
শুভপুর রাহাত সেন্টার থেকে পুড়া মসজিদ পর্যন্ত রাতে পার্কিং করা প্রতিটি ট্রাক থেকে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। একই চিত্র শুভপুর মোড় থেকে রশিদ মাস্টার বাড়ি সড়ক এলাকাতেও।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইব্রাহিম, ‘ল্যাংড়া’ শহিদ ও সিরাজ নামের তিন লাইনম্যান শ্রমিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক এ টাকা তুলে থানায় দায়িত্বরত কনস্টেবল ইদ্রিস আলম ও জাহেদ কামালের হাতে পৌঁছান।
শুভপুর রেলস্টেশন, কদমতলী ও আলম হোটেল মোড়ের ফুটপাত ও ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়।
তবে অপরাধের সবচেয়ে বড় লেনদেন চলে কর্ণফুলী নদীর বাংলা বাজার, আসাম বেঙ্গল, নবী দোভাষ, আদম ও আনু মাঝির ঘাটে।
সিরাজুল ইসলাম মিন্টু নামের এক ব্যক্তি নিজেকে থানার সাবেক ‘ক্যাশিয়ার’ দাবি করলেও, এখনো তাঁর মাধ্যমে অবৈধ পণ্যবোঝাই প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দিনে-রাতে খালাস হওয়া একাধিক গাড়ি থেকে তোলা টাকার বড় একটি অংশ পৌঁছায় সংশ্লিষ্টদের পকেটে। এছাড়া ড্রাইভার কনস্টেবল হাসনাত ও মং এই ঘাটে নিয়মিত টহল ও অর্থ আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
জুয়ার আসর ও অনৈতিক লেনদেন
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদকের পাশাপাশি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে তিনটি বড় জুয়ার আসর-মাঝিরঘাট এলাকায় ‘জুয়াড়ি নাসির’ পরিচালিত আসর, আদম ঘাটে ‘শিবির কালু’র আসর, এবং পশ্চিম মাদারবাড়ি কাঁচাবাজারে ঝন্টুর আসর।
এসব আসরে জুয়ার পাশাপাশি ফেনসিডিল ও ইয়াবার বিকিকিনিও অবাধ। এএসআই মুসতাক, কনস্টেবল হাসনাত ও কনস্টেবল মং অর্থের বিনিময়ে এসব অনৈতিক আস্তানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলার সুযোগ করে দেন বলে স্থানীদের স্পষ্ট অভিযোগ।
এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসআই শাহাদাত হোসেন তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, কোনো ধরনের অপরাধ বা অপরাধীর সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করে, তবে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একইভাবে অভিযুক্ত ক্যাশিয়ার মিন্টু জানান, তিনি বর্তমানে নিজস্ব ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং কোনো অনৈতিক অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত নন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি-কেবল দু-একজন ভাসমান মাদকসেবী বা খুচরা কারবারিকে নামমাত্র আটক না করে মাদক ও চাঁদাবাজির এই বিশাল নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থের উৎস এবং পুলিশের ভেতরের পথগুলোকে চিহ্নিত করে বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত চালানো এখন সময়ের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া সদরঘাট এলাকাকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


