রাবিপ্রবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে অনিয়ম: ২৯ শিক্ষকের ২৮ জনই বাইরের

পরীক্ষা ছাড়া চাকরি, বয়সে ছাড়-ছাত্রলীগের পর শিবিরের আধিপত্য

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫৪

পার্বত্য অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার আলো ছড়ানোর অভিপ্রায় নিয়ে ২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি)।

তবে প্রতিষ্ঠার এক দশক পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোর ওপর একের পর এক বিতর্কের কালো ছায়া ঢাকা পড়েছে।

বিশেষ করে সাবেক প্রশাসনের আমলে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত লঙ্ঘন এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বর্তমান সরকারের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এবং নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নিলেও অতীতের প্রশ্নবিদ্ধ ও অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল রাখা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে এখন স্থবিরতা ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

পরীক্ষা ছাড়া চাকরি ও শর্ত শিথিলের খেলা

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমানের কার্যকালে অন্তর্বর্তী সময়ে অন্তত ২৯ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই প্রতিযোগিতামূলক নীতি অনুসরণের বদলে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, বেশ কয়েকটি পদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকা সত্ত্বেও একক বা সীমিত প্রার্থীর আবেদনেই দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়।

অদ্ভুত সব বৈপরীত্য দেখা গেছে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও পদের সামঞ্জস্যে-অধ্যাপক পদের প্রার্থীকে সহযোগী অধ্যাপক, আবার সহযোগী অধ্যাপক পদের প্রার্থীকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ঘটেছে এন্ট্রি-লেভেলের প্রভাষক পদগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো বয়সসীমা শিথিল করা হয়।

শুধু তাই নয়, নির্ধারিত বয়সের বেশি বয়সী প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই নিয়োগ পাওয়ার নজির গড়া হয়েছে। এমনকি একাধিক প্রার্থী ইন্টারভিউ কার্ড ছাড়াই সরাসরি নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছেন, এমন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মুখে মুখে।

কর্মকর্তা নিয়োগেও একই ধরনের বিধিবহির্ভূত ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি অভিজ্ঞতা ছাড়াই বাইরের ব্যক্তিদের এনে বসানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক চেয়ারে।

ছাত্রলীগের পর শিবিরের আধিপত্য: 

২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ক্লাস শুরুর প্রাথমিক পর্বে ক্যাম্পাসটিতে পাহাড় ও সমতলের শিক্ষার্থীদের মাঝে আঞ্চলিক প্রভাবের দ্বন্দ দেখা গেলেও দ্রুতই তা রাজনৈতিক দখলাদারিত্বে রূপ নেয়। ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আধিপত্যে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েন।

তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমানের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসের ক্ষমতার সমীকরণে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক প্রশাসনের ছায়াতলে ছাত্রলীগের প্রভাবের পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক পদধারী ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা সংগঠিত হতে শুরু করেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন শিক্ষকের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে এই আদর্শিক ও রাজনৈতিক বলয়ের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী রাবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু নতুন প্রশাসনের অধীনে কোনো সুসংগঠিত কিংবা নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার বদলে পুরোনো বলয়ের প্রভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ।

রেজিস্ট্রার, ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রক্টর কিংবা গবেষণা ও প্রকাশনা দপ্তরের মতো সংবেদনশীল পদগুলোতে আগের আমলের বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তরাই এখনো বহাল রয়েছেন।

ফলে নামকাওয়াস্তে শীর্ষ পদে পরিবর্তন এলেও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এখনো আগের বলয়ের হাতেই বন্দী রয়েছে।

২৯ জনের মধ্যে স্থানীয় মাত্র ১

রাবিপ্রবির প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মূলনীতি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয়, নৃগোষ্ঠী ও অবহেলিত মেধাগুলোকে উচ্চশিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করা। কিন্তু শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে স্থানীয় যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি চরম বৈষম্য করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সাবেক প্রশাসনের আমালে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন শিক্ষকের মধ্যে পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা ছিলেন মাত্র ১ জন। পরবর্তী সময়ে তিনিও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান।

ফলে বর্তমানে ওই ২৯ জন শিক্ষকের মধ্যে স্থানীয়দের প্রতিনিধিত্ব শূন্যে এসে ঠেকেছে। একইভাবে কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদের ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের অবমূল্যায়ন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় বাইরে থেকে লোক এনে বসানো হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

বর্তমান প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ

রাবিপ্রবির এই বিতর্কিত নিয়োগ এবং অর্থ খরচের বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে ইউজিসি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বাজেট পর্যবেক্ষণ ও আর্থিক অডিটে বেশ কয়েকটি পদ ও নিয়োগের আর্থিক বরাদ্দ নিয়ে স্পষ্ট আপত্তি জানানো হয়েছে। ইউজিসির প্রাথমিক তদন্তে সাবেক উপাচার্যের আমলের নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির আলামত উঠে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভাগীয় প্রধান ও প্রশাসনিক পদে যদি বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তরা একই কায়দায় বহাল থাকেন, তবে নতুন প্রশাসন এসেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।

ক্যাম্পাসে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট বলয় ও পুরোনো সিন্ডিকেটের যে বলয় তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে হলে এসব নিয়োগের নথি প্রকাশ্যে এনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে রাবিপ্রবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংবিধি ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা এড়িয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের বিভাগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় সবদিক সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে হচ্ছে। সমস্যাগুলো সমাধানে নিয়মিত চিন্তাভাবনা ও আলোচনা চলছে।

সাবেক ভিসির আমলের অনিয়ম ও ইউজিসির প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত করে আরও বলেন, সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমানের সময়ে কিছু অনিয়মের সত্যতা ইউজিসি পেয়েছে এবং সেই আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে।

ইউজিসির নির্দেশনার ভিত্তিতে আমরা ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সার্বিক বিষয় এখন তদন্তাধীন থাকায় এই মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

জরুরি সংস্কার ও স্বচ্ছতার দাবি

শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাবিপ্রবির সচেতন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পার্বত্য অঞ্চলের নাগরিক সমাজ এখন একটিই দাবি জানাচ্ছেন-অবিলম্বে সাবেক প্রশাসনের সময়কার শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের যাবতীয় নথি, আবেদনপত্র, লিখিত-মৌখিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর এবং নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী সর্বসাধারণের সম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

আইনি ঝামেলার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি রক্ষা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্তই পারে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা থেকে উদ্ধার করতে।