আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই যখন ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও অপহরণের অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্নটা শুধু একটি মামলার গণ্ডিতে আটকে থাকে না। প্রশ্ন উঠে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
চট্টগ্রামের রাউজান থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ তিন পুলিশ সদস্যকে ঘিরে ওঠা এমনই এক অভিযোগে এবার সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেন আদালত।
চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-২ আদালত পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনকে কার্যত অগ্রাহ্য করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদী চিকিৎসক ডা. জাহাঙ্গীর আলমের নারাজি গ্রহণ করে দেওয়া এই আদেশ বিচার বিভাগের অসন্তুষ্টির স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়:
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে রাউজান উপজেলা নোয়াপাড়া পথেরহাটে বাদীর (চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম) পরিচালিত প্রাইভেট চেম্বারে অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখছিলেন।
এ সময় তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই টোটন মজুমদার, এসআই শাফায়েত আহমদ তার চেম্বারে ঢুকে বিএনপির কমিটিতে নাম থাকায় তাকে অপহরণ করে ক্রসফায়ারের হুমকি দেন।
অন্যথায় বাঁচতে চাইলে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এরপর জোরপূর্বক তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকের মাথায় পিস্তল রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তার চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে মারধর করে।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু হুমকিতেই থেমে থাকেননি অভিযুক্তরা। একই বছরের ৪ এপ্রিল একটি ‘সাজানো’ মামলা তৈরি করে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তাছাড়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ আসামি পাইওনিয়ার হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. ফজল করিম ওরফে বাবুল সহায়তায় ওই মিথ্যা মামলার চার্জশিট দিয়ে মামলার বিচার নিষ্পত্তির জন্য ২০১৫ সালের ১৮ জুন সংশ্লিষ্ট গ্রাম আদালতে পাঠান। যা পুরো ঘটনাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
পুলিশের তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন:
জানা গেছে, ঘটনাটির তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই হোসেন ইবনে নাঈম ভূঁইয়া গত ২৬ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু সেই প্রতিবেদন নিয়েই ওঠে সবচেয়ে বড় অভিযোগ।
বাদী জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রধান আসামি টোটন মজুমদার একই থানার সহকর্মী হওয়ায় তদন্তে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। বরং সহকর্মীদের রক্ষায় ‘মূল ঘটনা আড়াল করে সাজানো প্রতিবেদন’ দেওয়া হয়েছে।
আসামির তালিকায় কারা :
এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন, রাউজান থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই টোটন মজুমদার, পাইওনিয়ার হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. ফজল করিম ওরফে বাবুল, পাইওনিয়ার হসপিটালের পরিচালক মনজুর হোসেন, রাউজান থানার সাবেক এসআই শাফায়েত আহমদ ও পাইওনিয়ারের সুপারভাইজার মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তদন্তের ওপর আস্থা নেই আদালতের:
আইনজীবী মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন, আদালত বাদীর নারাজি গ্রহণ করে পিবিআইকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি প্রক্রিয়াগত আদেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুলিশের তদন্ত নিয়ে আদালতের অসন্তুষ্টির ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞ কয়েকজন আইনজীবীর সাথে কথা হলে তারা বলেছে, একই থানার কর্মকর্তারা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করেন, তখন সেই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ থাকে—এই প্রশ্ন নতুন নয়।
কিন্তু আদালতের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখাচ্ছে, অন্তত এই মামলায় সেই আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এখন নজর পিবিআইয়ের দিকে। তাদের তদন্তই নির্ধারণ করবে। অভিযোগগুলো সত্যিই কতটা ভয়াবহ, আর পুলিশের ভেতরে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি কতটা গভীরে প্রোথিত।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



