বোয়িং ডাবল-ডাউনে বিমানের নতুন আকাশ-কূটনীতি: আরও ১১ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩২

বিশ্বের যোগাযোগের মানচিত্রে নিজস্ব উপস্থিতি আরও শক্ত করতে বড় ধরনের কৌশলগত চাল চালল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ অধিবেশনের কূটনৈতিক বলয়কে কাজে লাগিয়ে নিউইয়র্কে মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি।

এই নতুন চুক্তির মধ্য দিয়ে কেবল বিমানের বহরই প্রসারিত হচ্ছে না, বরং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের খাতায়ও নতুন মাত্রা যোগ হলো।

চলতি বছরের এপ্রিলের ৩০ তারিখে বিমানের বহর আধুনিকায়নে বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তিতে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর নাগাদ সেই অর্ডারের খাতায় যুক্ত হলো আরও ১১টি নতুন উড়োজাহাজ।

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানেই বোয়িং থেকে বাংলাদেশের পরিকল্পিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৫টিতে।

নতুন ১১টি বোয়িংয়ের মডেল, নির্দিষ্ট বাজারমূল্য, অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং সরবরাহের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নিয়ে এখনই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও অ্যাভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা একে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ও নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণের সুদূরপ্রসারী চাল হিসেবে দেখছেন।

গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অনুষ্ঠিত এই চুক্তি স্বাক্ষর পর্বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন এবং বোয়িংয়ের পক্ষে কমার্শিয়াল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড ম্যাকমুলেন চুক্তিতে সই করেন।

পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি স্পষ্ট জানান, আন্তর্জাতিক রুটের দ্রুত সম্প্রসারণ, নতুন সংযোগ স্থাপন এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক যোগাযোগের চাহিদা পূড়ণেই এই সাহসী বিনিয়োগ।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ দুই দেশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।

একই সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন চুক্তিটিকে উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও উইন-উইন পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের এই বড় বিনিয়োগের জবাবে বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারবাস’-এর দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।

মাহদী আমিন এবং রুমী এ হোসেন উভয়ের বক্তব্যেই এটি স্পষ্ট-ভবিষ্যতে বিমান তার বহরের বৈচিত্র্য ও কৌশলগত প্রয়োজনে এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনায় যেতে পারে।

ইতোমধ্যে বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার আলাদা একটি প্রস্তাবও টেবিল থেকে বাদ যায়নি।

এটি ইঙ্গিত দেয়, একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিমান একটি ‘মাল্টি-মেকার’ বা ব্যালেন্সড ফ্লিট নীতির দিকে হাঁটছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কেবল যাত্রী পরিবহন করে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল।

নতুন উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা কিংবা সক্ষমতার অভাবে চালু করতে না পারা বিভিন্ন লাভজনক আন্তর্জাতিক রুট সচল করা সহজ হবে।

এর পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং ঘন ঘন শিডিউল বিপর্যয়ের দুর্নাম ঘোচানোর একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের খবর যেমন ইতিবাচক, তেমনি উড়োজাহাজগুলোর ডেলিভারি সিডিউল, ক্রু ও কারিগরি দলের সক্ষমতা বৃদ্ধি, লাভজনক রুট নির্ধারণ এবং ঋণ বা অর্থায়নের সুদের হার কীভাবে সামলানো হবে-তা হবে বিমানের প্রকৃত পরীক্ষার বিষয়।

যদি সঠিকভাবে নতুন রুটের বাণিজ্যিক বাজার পরিচালনা করা সম্ভব হয়, তবে বোয়িংয়ের সঙ্গে এই নতুন চুক্তি বিমান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি