শিল্প ও পর্যটনের জন্য পরিচিত চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে এবার ভিন্ন রূপের এক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। অদৃশ্যে ঘাপটি মেরে থাকা এডিস মশার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে লক্ষ্য একটাই-আগামী সাত দিন পর পুরো সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গুর কোনো ‘হটস্পট’ রাখা যাবে না।
এ পর্যন্ত অন্তত ৫১৬ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া সীতাকুণ্ডে শনিবার থেকে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান।
উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
সীতাকুণ্ড পৌরসভা থেকে শুরু হওয়া একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র্যালি কলেজ রোড প্রদক্ষিণ করে। র্যালি শেষে জেলা প্রশাসক নিজেই নেমে পড়েন ড্রেন পরিষ্কারে এবং ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানোর কাজে।
কর্মসূচির সূচনাতেই জেলা প্রশাসক তাঁর দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে বলেন, সীতাকুণ্ডকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা চাই না এই রোগে আর একটি প্রাণও ঝরে যাক।
সাত দিন পর যখন সীতাকুণ্ডে আর কোনো হটস্পট থাকবে না এবং আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, তখনই আমাদের এই উদ্যোগ সফল হবে। একই সাথে শিল্পাঞ্চল হিসেবে সীতাকুণ্ডের জন্য পরিকল্পিত ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, পুরো সীতাকুণ্ডের সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একযোগে এই অভিযান চললেও বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে চিহ্নিত সাতটি মূল হটস্পট-ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি, জেলেপাড়া, বাড়বকুণ্ড, ফুলতলা, বার আউলিয়া এবং সীতাকুণ্ড কলেজ রোড এলাকা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে নতুন ১৬টি ফগার মেশিন ও প্রয়োজনীয় কার্যকর লার্ভিসাইড সংগ্রহ করা হয়েছে। সাত দিনের এই বিশেষ ঝটিকা অভিযান শেষ হলেও ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক ও শিল্প কাঠামোর কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে এলাকার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি জাহাজভাঙা (শিপব্রেকিং) শিল্পের পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ ধাতুর ওপর বৃষ্টির পানি জমে সহজেই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি সাধারণ নাগরিকদেরও বাড়িঘর ও আশপাশের ড্রেনে জমে থাকা পানি অনতিবিলম্বে সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানান।
অভিযান সফল করতে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তাই নন, এককাতারে শামিল হয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকেরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনসহ উপজেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।
প্রশাসন কঠোর, মাঠ পর্যায়ে ওষুধ ও নতুন যন্ত্রপাতি প্রস্তুত-এখন প্রশ্ন একটাই, আগামী সাত দিনে সীতাকুণ্ডবাসী কি পারবে ডেঙ্গুর এই আতঙ্ক পুরোপুরি মুছে ফেলতে? নাগরিক সচেতনতা আর প্রশাসনিক তৎপরতার এই মেলবন্ধনই এখন সীতাকুণ্ডের আশার আলো।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


