নীরব কষ্টের ভাষা বুঝতে ঢাকায় ৩৫০ মানুষের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪০

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করা আমাদের সমাজে আজও যেন এক নীরব সামাজিক বাধা বা দ্বিধার নাম। নিজের মনের ভেতরের ক্ষতের কথা প্রকাশ করতে অনেকেই ভয় পান, আবার অনেক সময় পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রের কাছের মানুষটি যে নীরবে লড়াই করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন-তা বুঝে ওঠার সংবেদনশীলতাও আমরা হারিয়ে ফেলি।

সমাজে প্রচলিত এই অদেখা দেয়াল ভাঙার বার্তা নিয়ে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত হয়ে গেল এক ব্যতিক্রমী ‘মেন্টাল হেলথ অ্যাম্বাসেডর ট্রেনিং’।

এ বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল সুর ছিল-বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনলেই আসবে সত্যিকারের পরিবর্তন। এই প্রতিপাদ্যকে পাথেয় করে লাইফস্প্রিং-এর এই উদ্যোগে যেন প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল অভিজ্ঞতা বিনিময়, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের নিখাদ উন্মুক্ততায়।

মানুষের মনের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনা, মানসিক সংকটের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারা এবং সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন করার যোগ্যতা তৈরি করাই ছিল দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য।

অনুষ্ঠানে প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যের নানাদিক তুলে ধরেন কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ মুনমুন জাহান। কর্মক্ষেত্রের অমানবিক চাপ, পারিবারিক দ্বায়িত্বের বোঝা এবং দৈনন্দিন জীবনের অদম্য টানাপোড়েনের মাঝেও কীভাবে নিজের মনের যত্ন নেওয়া যায়, সেই ব্যবহারিক উপায়গুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরেন তিনি। সেই সঙ্গে কোন পর্যায়ে গেলে বিশেষজ্ঞের দ্বারে যাওয়া জরুরি, তার স্পষ্ট নির্দেশনা দেন এই চিকিৎসক।

সমাজের অন্যতম স্পর্শকাতর কিন্তু সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ গোলাম মুস্তফা মিলন।

মানসিক রোগ এবং যৌন স্বাস্থ্যের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে তিনি বলেন, সংকোচ ও লজ্জা চেপে না রেখে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করাই সুস্থ জীবনের একমাত্র চাবিকাঠি।

কিশোর-কিশোরীদের ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যা প্রবণতা ও তার প্রতিরোধ নিয়ে এক হৃদয়গ্রাহী বার্তা দেন চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ হুমাইরা শাহজাহান হৃদি।

সতর্কতামূলক লক্ষণ বা ‘ওয়ার্নিং সাইন’ চেনা, সহানুভূতিশীল মনে পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত পেশাদার সহায়তার সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে কীভাবে একেকটি তাজা প্রাণ বাঁচানো সম্ভব-তা তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।

অন্যদিকে, শিশু-কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে বাস্তবসম্মত গাইডলাইন নিয়ে হাজির হন চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ তৌহীদা ফেরদৌসি। বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ কোনটা আর কোনটা যে গভীর উদ্বেগের বিষয়-অভিভাবক ও শিক্ষকদের সেই তফাৎ চেনার বৈজ্ঞানিক উপায় শিখিয়ে দেন তিনি।

আয়োজনের একটি বিশেষ মাত্রা ছিল লাইফস্প্রিং উত্তরা শাখার বিশেষজ্ঞ দলের সরাসরি উপস্থিতি।

শুধু তত্ত্বীয় প্রশিক্ষণেই বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ঘটনাস্থলেই ৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দেওয়া হয়।

জীবনের প্রথমবার কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মুখামুখি হয়ে মনের ভার নামাতে পেরে অনেক অংশগ্রহণকারীকেই আবেগপ্লুত হতে দেখা যায়।

উল্লেখ্য, বেসরকারি খাতে বিগত ৯ বছর ধরে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এক অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে লাইফস্প্রিং।

অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বের ৩৬টিরও বেশি দেশে সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকার তিনটি শাখা ও চট্টগ্রাম শাখায় নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রশিক্ষণ শেষে আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এখান থেকে তৈরি হওয়া ৩৫০ জন প্রশিক্ষিত অ্যাম্বাসেডর বা ‘মানসদূত’ এবার ছড়িয়ে পড়বেন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে।

প্রতিটি আঙিনায় তারা ছড়িয়ে দেবেন সহমর্মিতা ও সচেতনতার আলো, যার মাধ্যমে একটু একটু করে ঘুচে যাবে আমাদের সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীরবতা ও দূরত্ব।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি