জাল স্বাক্ষর আর ভুয়া গ্যারান্টিনামা তৈরি করে ব্যাংক থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বাগিয়ে নেওয়ার এক রোমাঞ্চকর ও চাঞ্চল্যকর ঋণ জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহ আলমকে ১৬ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন।
তবে আইন অনুযায়ী সব ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় এই ব্যবসায়ীকে সর্বমোট পাঁচ বছর কারাভোগ করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাহ আলম আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি পলাতক থাকায় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজার পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
দুদকের পিপি অ্যাডভোকেট মোকাররম হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণে জালিয়াতির ঘটনাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আদালত দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় ৩ বছর, ৪৬৭ ধারায় ৫ বছর, ৪৬৮ ধারায় ৩ বছর এবং ৪৭১ ধারায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।
পাশাপাশি আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, জালিয়াতির এই জাল বোনা শুরু হয়েছিল আরও দুই দশক আগে। আসামি মোহাম্মদ শাহ আলম ও তাঁর ছেলে এস এম পারভেজ আলম পরস্পর যোগসাজশে ২০০৪ সালে শাহ আলমের তিন সহোদরের স্বাক্ষর জাল করেন।
তৈরি করা হয় চারটি ভুয়া ব্যক্তিগত গ্যারান্টিনামা। সেই নথিপত্রে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রত্যেকের নামে দেখানো হয় ২৫ কোটি টাকার বিপুল সম্পদ!
কাগজে কলমে অঢেল সম্পদের এই জালিয়াতির নথি বগলে চেপে ২০১২ সালে এই পিতা-পুত্র পা বাড়ান বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের প্রিমিয়ার ব্যাংকে।
ব্যাংকটির কোতোয়ালী অধীনস্থ শাখা থেকে পাঁচটি এলটিআর (LTR) ও একটি সিসি (হাইপো) ঋণ সুবিধার বিপরীতে কৌশলে উত্তোলন করে নেন ২৯ কোটি ৯৯ লাখ ৫৯ হাজার ২৮২ টাকা।
লোন নেওয়ার পর মাত্র ৮ কোটি ৩২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৮ টাকা পরিশোধ করা হলেও দিনশেষে সুদে-আসলে সেই বকেয়ার পাহাড় দাঁড়ায় প্রায় ৪০ কোটি টাকায়।
২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বকেয়া আসল, সুদ ও বিভিন্ন চার্জ মিলিয়ে মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৯ কোটি ৬৮ লাখ ১৪ হাজার ৭১২ টাকা।
রাষ্ট্রীয় ও ব্যাংকের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের চক্রান্ত ফাঁস হলে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক এইচ. এম. আখতারুজ্জামান বাদী হয়ে নগরের কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হলে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন আদালত।
দীর্ঘ লড়াই ও প্রমাণাদি পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তে হলো জালিয়াতির এই চক্রটিকে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


