জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ এক যুগ আগে দেশ ছেড়েছিলেন বাঁশখালীর তরুণ মো. জসিম উদ্দিন (৩৫)।
ভোরের আলোয় স্বজনদের মুখে একটু হাসির ঝিলিক ফুটাতে, পরিবারের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নিতে মোজাম্বিকের মাটিতে গড়ে তুলেছিলেন নিজের ব্যবসা। গত এক বছর আগে শেষবার বাড়ি এসেছিলেন।
এবারও বুকভরা জমে থাকা কত গল্প আর স্বজনদের জন্য উপহারের ঝুলি নিয়ে ফিরছিলেন প্রিয় জন্মভূমিতে। কিন্তু কে জানত, দূর পরবাসের সেই চেনা পথ ধরে ফেরা হলেও জসিম আর হেঁটে বাড়ি ফিরবেন না!
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ৬টা ৪৫ মিনিট। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁয়েছিল কার্গো বিমানটি।
কিন্তু সেখান থেকে নেমে আসেননি জসিম, নেমে এসেছে কাঠ আর সিসায় মোড়ানো এক নিথর কফিন। সাত দীর্ঘ দিন ধরে স্বজনদের যে আকুল প্রতীক্ষা ছিল, তার সমাপ্তি ঘটল কান্না আর ভারী নিঃশ্বাসে।
নিহত জসিম উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বল ছড়ারকুল (৭ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকার সন্তান।
পিতা মোহাম্মদ ছৈয়্যদ মিয়া ও মা মাবিয়া খাতুনের কোল আলো করে আসা এই তরুণ ছিলেন পুরো পরিবারের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর (শুক্রবার) মোজাম্বিকের মাপুতো বিমানবন্দর থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন জসিম। উদ্দেশ্য ছিল কাতারের দোহা হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছানো।
কিন্তু কারোর জানা ছিল না, মোজাম্বিক থেকে দোহার সেই দীর্ঘ ফ্লাইটটিই হবে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।
নীল আকাশের বুকে যখন উড়োজাহাজটি ভাসছিল, তখনই হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন তিনি।
মুহূর্তেই থমকে যায় ১২ বছরের লড়াকু জীবনের হৃদস্পন্দন। উড়োজাহাজ কাতার নামার পর তাঁর নিথর দেহ রাখা হয় দোহাস্থ হামাদ হাসপাতালের মর্গে।
পরের গল্পটা শুধুই স্বজনদের ব্যাকুলতা আর আইনি প্রক্রিয়ার।
জসিমের বড় ভাই মো. ইউনুস অশ্রুসজল চোখে জানান, কাতারে যাবতীয় আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের সময় লেগে যায় কয়েক দিন।
এরপর বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে কার্গো ফ্লাইটে কফিনবন্দি মরদেহ পাঠানো হয় চট্টগ্রামের উদ্দেশে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও কফিন দেশে আনতে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
বৃহস্পতিবার সকালে বিমানবন্দর থেকে যখন সাদা একটি অ্যাম্বুলেন্স সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাঁশখালীর ছড়ারকুলে জসিমের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা, স্ত্রী আর অবুঝ তিনটি সন্তান।
মৃত্যুকালে জসিম স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও স্বজন রেখে গেছেন।
যে বাবা বাড়ি ফিরলে সন্তানেরা খুশিতে মেতে উঠত, আজ সেই বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে নিষ্পাপ চোখগুলো বুঝে উঠতে পারছে না বিচ্ছেদের চিরন্তন অর্থ।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় স্থানীয় পূর্ব চাম্বল ছড়ারকুল লোদী জামে মসজিদ মাঠে জসিম উদ্দিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


