এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর গত মঙ্গলবার থেকে আবারও লাগাতার কর্মবিরতি শুরু হয়।
নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদের তদন্ত চেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি আসার পর পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেয়া এবং বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে আজ (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল আটটা থেকে লাগাতার ধর্মঘট শুরু করেছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’।
ধর্মঘটের প্রভাবে বন্দরের মূল জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে দেশের আমদানি রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকে বন্দরের মূল জেটিতে অবস্থানরত ১২টি জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রয়েছে। একইসঙ্গে বহির্নোঙরে থাকা পণ্যবাহী অর্ধশতাধিক জাহাজ থেকেও কার্গো ও কনটেইনার খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এর পাশাপাশি বন্দরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা ও ইয়ার্ড কার্যক্রমও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বন্দর এলাকা ও আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সংকট ও উত্তেজনার নেপথ্যে
এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন বন্দর সংশ্লিষ্ট শ্রমিক কর্মচারীরা।
পরে গত মঙ্গলবার থেকে আবারও লাগাতার কর্মবিরতি শুরু হয়। নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদের তদন্ত চেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি আসার পর পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আন্দোলনকারীরা চলমান সংকটের জন্য বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে দায়ী করে তার অপসারণের জোরালো দাবি তুলেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এনসিটি ইজারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে না দেয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা, সংকট সৃষ্টির অভিযোগে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তিমূলক বদলি ও অন্যান্য ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ার নিশ্চয়তা প্রদান।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন অভিযোগ করে বলেন, ‘শনিবার রাত থেকে রোববার সকালের মধ্যে পরিষদের দুজন প্রবীণ নেতাকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমানো যাবে না। বরং এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠবে।
কনটেইনার চাপ বাড়ার শঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) তথ্য অনুযায়ী, ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে মোট ৪১ হাজার ৮৭ টিইইউ কনটেইনার অবস্থান করছে, যা মোট ধারণক্ষমতা ৫৯ হাজার টিইইউর প্রায় ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বন্দরে ফুল কনটেইনার লোড (এফসিএল) রয়েছে ৩১ হাজার ১৩৩ টিইইউ। ডিপোতে রয়েছে ১ হাজার ৯৩৭ টিইইউ এবং এলসিএল কনটেইনার রয়েছে ১ হাজার ১৭২ টিইইউ।
পাশাপাশি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) রয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টিইইউ এবং ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) রয়েছে ১৩৫ টিইইউ।
এছাড়া বন্দরের ইয়ার্ডে খালি কনটেইনার (এমটিওয়াই) রয়েছে ৩ হাজার ৪৫৪ টিইইউ এবং রফতানি পণ্যের কনটেইনার রয়েছে ১ হাজার ৬২৬ টিইইউ।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, ইয়ার্ডে এখনও কিছুটা ধারণক্ষমতা থাকলেও ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে। বিশেষ করে আমদানি কনটেইনার ডেলিভারি সীমিত থাকলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি হবে। সূত্র: বণিক বার্তা
ব্যবসায়ী ও শিপিং সংশ্লিষ্টরা দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সি-কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমন একটি পরিস্থিতির মুখে পড়েছি, যেখানে ব্যবসায়ীদের কোনো দায় না থাকলেও ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না এলে বাণিজ্যে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


