চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বড় পশুর হাট সাগরিকা। প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহা ঘিরে এই হাটকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে কোরবানির পশুর সবচেয়ে বড় বেচাকেনা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে এই হাটের অর্থনীতি, ব্যবসার ধরন এবং ইজারাবাজারের চিত্রও।
গত বাংলা সনে প্রত্যাশিত দর না পাওয়ায় সাগরিকা পশুর হাট ইজারা দিতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এবারও শুরুটা ছিল একই রকম অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
প্রথম দুই দফায় একটি দরপত্র ফরমও জমা পড়েনি। তৃতীয় দফায় তিনটি ফরম জমা পড়লেও কাঙ্ক্ষিত দর মেলেনি। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ দফায় এসে মিলেছে স্বস্তির খবর।
এবার সাগরিকা পশুর হাটের ন্যূনতম দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ কোটি ২ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর এসেছে ৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এই দর দিয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। মোট ৬টি দরপত্র ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ৪টি।
গত বৃহস্পতিবার দরপত্র বক্স খোলা হয়। এখন দরপত্র কমিটির সভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে হাট বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তবে সেই সভার তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এই অগ্রগতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য স্বস্তির।
আগামী ২৭ বা ২৮ মে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হতে পারে। তার আগেই নগরের সবচেয়ে বড় পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। সাগরিকার ইজারামূল্য এখনও নিম্নমুখী। তিন বছরের হিসাবে এবারই সর্বনিম্ন দর পাওয়া গেছে।
১৪৩১ বাংলা সনে এই হাট থেকে সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছিল ৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। তার আগের বছর, অর্থাৎ ১৪৩০ বাংলা সনে ইজারা উঠেছিল ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। সেই তুলনায় এবার দর কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল জানিয়েছেন, প্রত্যাশিত দর না পাওয়ায় বারবার দরপত্র আহ্বান করতে হয়েছে।
অবশেষে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দর পাওয়া গেছে। ফলে সর্বোচ্চ দরদাতাকেই হাট ইজারা দেওয়া হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কমছে পশুর হাটে ইজারাদারদের আগ্রহ?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোরবানির পশু কেনাবেচার বাজারে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে পশুর হাটই ছিল কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র।
এখন অনেক ক্রেতা সরাসরি খামার থেকে পশু কিনছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমছে, একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হাটের ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাচ্ছে।
এর পাশাপাশি ঈদ মৌসুমে নগরের বিভিন্ন অলিগলি, খোলা জায়গা এবং আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য অস্থায়ী ও অবৈধ পশুর হাট।
এসব হাটে সহজে যাতায়াত, কাছাকাছি অবস্থান এবং স্থানীয় সুবিধার কারণে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ সেদিকেই ঝুঁকছেন। ফলে সাগরিকার মতো বড় হাটেও আগের মতো ভিড় দেখা যায় না।
নিয়ম অনুযায়ী বাংলা সনের প্রথম দিন থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য স্থায়ী হাট ইজারা দেওয়া হয়। সে হিসাবে আগামী বছরের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সাগরিকা পশুর হাট থেকে হাসিল আদায় করতে পারবেন ইজারাদার।
চট্টগ্রাম নগরের তিনটি স্থায়ী পশুর হাট হলো সাগরিকা, বিবিরহাট এবং পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। এর মধ্যে আরেকটি পশুর হাট ইতোমধ্যে ৬৭ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে নগরে ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
এ জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে হাট বসানোর আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অনাপত্তি প্রয়োজন।
পুলিশের অনাপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুমতি দিলে এসব হাট ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।
প্রস্তাবিত অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাকলিয়ার নূর নগর হাউজিংয়ে কর্ণফুলী পশুর বাজার, পতেঙ্গায় টি কে গ্রুপের খালি মাঠ, পূর্ব হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো রোডসংলগ্ন টিএসপি মাঠ, সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, বড়পোলের মহেশ খালের দুই পাড়, ওয়াজেদিয়া মোড়, আউটার রিং রোডের সিডিএ বালুর মাঠ, মোহরার জানালী হাট রেলস্টেশনের পাশের খালি জায়গা, মধ্যম হালিশহরের মুনির নগর, সল্টগোলা রেল ক্রসিং, চৌধুরী হাট, হালিশহর পুলিশ লাইনের সামনে, মাদারবাড়ি পোর্ট সিটি হাউজিং, পতেঙ্গা স্টিল মিল বাজার, উত্তর হালিশহর গলিচিপা পাড়া বারুনিঘাটা মাঠ এবং অলংকার গরুর মাঠ।
সাগরিকা পশুর হাটের ইজারা সম্পন্ন হওয়ার পথে থাকলেও এটি হাটের গল্প নয়। এটি নগরীর পরিবর্তিত কোরবানির বাজারব্যবস্থা, ক্রেতার আচরণ এবং পশু বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বাজারব্যবস্থার এই রূপান্তরই এখন সাগরিকা পশুর হাটের নতুন অর্থনীতি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



