চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা শুধু বর্ষাকালের দুর্ভোগ নয়, বরং সারা বছরের নগর-বাস্তবতা। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, অলিগলি তলিয়ে যায়, থমকে দাঁড়ায় জনজীবন।
এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো ময়লায় ভরাট হয়ে যাওয়া নালা-নর্দমা ও খাল।
বছরের পর বছর ধরে অব্যবস্থাপনা, নাগরিক অসচেতনতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি খেসারত দিচ্ছেন নগরবাসী।
এই জনভোগান্তি লাঘবে মাসব্যাপী নালা-নর্দমা পরিস্কার কার্যক্রম জোরদার করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।
এর অংশ হিসেবে সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচালিত হয় বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’। এদিন সরেজমিনে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম তদারকি করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
সকালে তিনি প্রথমে ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের জে. এম. সেন স্কুলের পেছনে অবস্থিত বান্ডেল খাল এলাকায় চলমান পরিস্কার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
পরে পর্যায়ক্রমে ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের বদর খালি খাল (ইসলাম কলোনি) এবং ৩৫ নম্বর বক্সিরহাটা ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যম পীতম্বরশাহ এলাকায় নালা-নর্দমা পরিষ্কার কার্যক্রম পরিদর্শন ও তদারকি করেন।
পরিদর্শনকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নগরীর বিভিন্ন স্থানে নালা-নর্দমা ময়লার স্তুপে পরিণত হয়েছে, যা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
তাঁর ভাষায়, “কিছু অসচেতন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে নালাগুলোকে কার্যত বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না।”
তিনি বলেন, শুধু সিটি কর্পোরেশনের একক উদ্যোগে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করতে না পারলে এ কর্মসূচির শতভাগ সফলতা আসবে না।
“এই শহর আমাদের সবার। এ শহরের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। নিজ নিজ দোকান ও বাসার জন্য আলাদা ডাস্টবিন রাখতে হবে এবং নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলতে হবে,” বলেন তিনি।
ডাস্টবিন চুরির ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মেয়র। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরও সক্রিয় তদারকির আহ্বান জানান তিনি।
কারণ, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নেওয়া উদ্যোগ বারবার ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষেরই।
অন্যদিকে, নগর পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন মেয়র।
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্ন কর্মীরা শহরের নীরব যোদ্ধা। তাদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম অগ্রাধিকার।”
বর্তমানে অনেক কর্মী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, তাদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশোধন অনুযায়ী মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৯ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা পূর্বের ২৩১ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের হালনাগাদ রেট সিডিউল এবং পরামর্শকের নতুন নকশা অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় পুনর্নির্ধারণকে উল্লেখ করেন মেয়র।
তিনি আরও জানান, স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বান্ডেল কলোনিতে নির্ধারিত দুটি ভবনের একটি নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ওই ভবনটি ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডে চসিকের নিজস্ব জায়গায় নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত সেবকদের পুনর্বাসনে সময় লাগায় কাজ শুরুতে বিলম্ব হয়েছে বলেও জানান মেয়র। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় সাতটি ভবনে মোট ১,০৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে প্রায় ৬০০ বর্গফুট।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিকল্পিত আবাসনে বসবাসের সুযোগ পাবেন। এতে তাদের সামাজিক মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মস্পৃহাও আরও জোরদার হবে।
মেয়র বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে নগরীকে পরিষ্কার রাখছেন। তাই তাদের আবাসনসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা চসিকের দায়িত্ব।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী, উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি, মেয়রের একান্ত সহকারী (রাজনৈতিক) জিয়াউর রহমান জিয়া, মেয়রের একান্ত সহকারী মারুফুল হক চৌধুরীসহ স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



