ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব যে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘাড়েই এসে পড়বে, তা অনেকটাই অনুমিত ছিল। এবার সেটিই বাস্তব হলো।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সড়কপথে যাত্রী পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে নতুন হার নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এর ফলে চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে আন্তজেলা এবং দূরপাল্লার প্রায় সব রুটেই যাত্রীদের এখন বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
এমন এক সময়ে এই ভাড়াবৃদ্ধি কার্যকর হলো, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম এবং স্থবির আয় সাধারণ মানুষের জীবনকে আগেই চাপে ফেলে রেখেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এখন শুধু অর্থনীতির সূচকে সীমাবদ্ধ নয়। এর অভিঘাত সরাসরি পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য, ডলার বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার রেশ এখন গণপরিবহনে। আর সেই চাপের প্রধান বাহক হয়ে উঠেছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। নতুন এই হার গত বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।
ফলে চট্টগ্রাম মহানগরে ৫২ আসনের বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে এখন ২ টাকা ৫৩ পয়সা হয়েছে।
ফলে কালুরঘাট ব্রিজ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এখন গুনতে হবে ৩৫ টাকা। একইভাবে, চকবাজার মসজিদ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত স্বল্প দূরত্বের যাত্রাতেও সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, দূরত্ব কম হলেও খরচের চাপ থেকে রেহাই নেই।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার পথের ভাড়া এখন ৪৭ টাকা।
তবে এই রুটে নিউমার্কেট থেকে বাদামতলী পর্যন্তও ন্যূনতম ভাড়া ১০ টাকা। স্বল্প আয়ের যাত্রীদের জন্য এই ‘ন্যূনতম ভাড়া’ই এখন বড় উদ্বেগের কারণ।
দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য চাপ আরও বেশি। আন্তজেলা ও দূরপাল্লার ৫১ আসনের বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ২৩ পয়সা।
কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবহন কোম্পানি আরামদায়ক ভ্রমণের যুক্তিতে আসন সংখ্যা কমিয়ে ৪০-এ নামিয়ে আনে।
এর ফলে একই দূরত্বে যাত্রীদের গুনতে হয় আরও বেশি ভাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সেতু ও ফেরির টোল। ফলে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরেও ব্যয় বাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে।
ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রাম রুটে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০৪ টাকা। ৪০ আসনের বাসে এই ভাড়া ৮৯২ টাকা। এর সঙ্গে টোল বাবদ অতিরিক্ত ৪৫০ টাকা যোগ হবে। অর্থাৎ, একটি পরিবার বা একাধিক সদস্য একসঙ্গে ভ্রমণ করলে খরচের অঙ্ক আরও দ্রুত বাড়বে।
কক্সবাজার রুটে ৫১ আসনের বাসভাড়া ৯০০ টাকা, আর ৪০ আসনের বাসে ১ হাজার ১৪৭ টাকা। টেকনাফ রুটে এই ভাড়া যথাক্রমে ১ হাজার ৪৭ টাকা ও ১ হাজার ৩৩৫ টাকা।
পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে যারা নিয়মিত দূরপাল্লার যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এটি নতুন আর্থিক চাপ।
চট্টগ্রাম থেকে ফেনী হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত ১৪৭ কিলোমিটার পথে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া ৩২৮ টাকা, ৪০ আসনের বাসে ৪১৮ টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১৫৪ কিলোমিটার রুটে ৫১ আসনের বাসে ৩৪৩ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৪৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসব রুটে প্রতিদিন যাতায়াতকারী চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যয়ও এখন বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি ব্যয়ের ভার কতটা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দিতে সরকার প্রায়ই গণপরিবহনে ভর্তুকি দেয় বা নির্দিষ্ট শ্রেণির যাত্রীদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করে।
বাংলাদেশে সে ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো সীমিত। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রায় পুরো চাপই গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসের দাম না বাড়ায় গ্যাসচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি সতর্ক করেছেন, গ্যাসচালিত যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, ভাড়া তালিকা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে প্রায়ই ফারাক দেখা যায়। অতীতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের বহু অভিযোগ উঠেছে।
এখানেই মূল উদ্বেগ। ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত যত দ্রুত কার্যকর হয়, তত দ্রুত কি কার্যকর হয় নজরদারি?
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করা হয়। বিশেষ করে ব্যস্ত রুট, পিক আওয়ার এবং উৎসবের সময়ে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়।
বাংলাদেশের নগর ও আন্তজেলা পরিবহন ব্যবস্থা এমনিতেই নানা সংকটে জর্জরিত। অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, সেবার মানের বৈষম্য এবং দুর্বল তদারকি দীর্ঘদিনের সমস্যা।
তার ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিজনিত ভাড়ার চাপ সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
অর্থনীতির ভাষায় এটি কেবল ‘কস্ট পুশ ইনফ্লেশন’-এর একটি উদাহরণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায়, এটি জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়া।
প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসার জন্য শহরে আসা কিংবা পরিবার নিয়ে দূরপাল্লার সফর। সবকিছুতেই এখন বাড়তি ব্যয়ের হিসাব কষতে হবে।
ভোগান্তিতে পড়া একাধিক যাত্রী ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে ভাড়া বাড়বে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, এই সমন্বয়ের ভার যেন একতরফাভাবে শুধু যাত্রীর পকেটেই না পড়ে।
সুশাসন, কার্যকর নজরদারি এবং গণপরিবহনে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। আপাতত ডিজেলের আগুনে সবচেয়ে বেশি পুড়ছে যাত্রীর পকেটই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



