back to top

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্পে অনিয়মের বিস্ফোরণ, শ্রমিকজীবন যেন তুচ্ছ!

৭ বছরে ৬৫% কাজ, নিরাপত্তাহীন কাজে দুই শ্রমিকের প্রাণহানি

প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৫৭

চট্টগ্রাম মহানগরীর বহুল প্রতীক্ষিত ওয়াসার ‘পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন’ প্রকল্প এখন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও গাফিলতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

গেল সাত বছর আগে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। অগ্রগতি থেমে আছে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশে। অথচ দুই দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।

এই সংশয়ের মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভোরে নগরীর আগ্রাবাদের এক্সেস রোডে ওয়াসার খননকাজে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

মাটি ধসে প্রাণ হারান দুই শ্রমিক। মো. রাকিব (৩০) ও মো. আইনুল ইসলাম (তুষার)। আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সাগর ও এরশাদ। উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তাহীনতা কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এই দুর্ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ।

শ্রমিকদের অভিযোগ, দুর্ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতারই পরিণতি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী রাব্বীর নির্দেশে নির্ধারিত সীমানার বাইরে খননকাজ চালানো হচ্ছিল।

যেখানে লম্বায় ২ মিটার এবং গভীরতায় ৩ দশমিক ৫৫০ মিটার খননের কথা, সেখানে জোরপূর্বক ৬ মিটার লম্বা এবং ৩ দশমিক ৬৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করানো হয়। শ্রমিকরা আপত্তি তুললেও তা উপেক্ষা করা হয়। অতিরিক্ত খননের ফলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে একপর্যায়ে ধস নামে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাইপ বসানোর আগে মাটির অবস্থা যাচাই করতে ‘ট্রায়াল পিট’ খনন করা হচ্ছিল। প্রায় আড়াই মিটার গভীরতায় কাজ চলাকালে হঠাৎ মাটি ধসে পড়ে। যন্ত্রপাতিসহ চাপা পড়েন শ্রমিকরা। ঘটনাটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম, সতর্কতামূলক চিহ্ন কিংবা মাটি ধস প্রতিরোধে কোনো কার্যকর সাপোর্ট সিস্টেম ছিল না।

গভীর খননকাজে যেখানে সেফটি হার্নেস, গ্যাস ডিটেক্টর, অক্সিজেন সরবরাহকারী মাস্ক, হেলমেট, গ্লাভস, বুট ও কভারঅল বাধ্যতামূলক, সেখানে অধিকাংশ শ্রমিক কাজ করছিলেন ন্যূনতম সুরক্ষা ছাড়াই।

শুধু এই ঘটনাস্থলই নয়, প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মস্থলেই একই চিত্র। শ্রমিকরা জানান, স্যুয়ারেজ প্রকল্পে কর্মরত অনেকেই নিয়মিত মাস্ক, গ্লাভস, বুট বা অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পান না। অনেক সময় কোন কোন স্পটে কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হলেও অস্বস্তিকর হওয়ার কারণে অনেক শ্রমিক তা ব্যবহার করতে চান না। সেক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব রয়েছে।

ফলে গভীর খকন কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মিথেনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আসছেন শ্রমিকরা। এতে তাদের শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, হৃদরোগ এবং সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শ্রমিকদের কাজে নিয়োগের আগে কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না। এমনকি প্রকল্পের চুক্তিতেই কোনো চিকিৎসক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

প্রতিদিন শত শত শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও তাদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের আওতায় অর্ধ শতাধিক স্পটে কর্মরত এক হাজার থেকে ১২০০ শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনো এমবিবিএস চিকিৎসকের মাধ্যমে করানো হয় না।

তার ভাষায়, “সে সুযোগও প্রকল্পে নেই।” এই বক্তব্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে।

অতচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের আইনগত দায়িত্ব।

নতুন শ্রমিকদের জন্য ইন্ডাকশন ট্রেনিং, অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, জরুরি নির্গমন প্রক্রিয়া এবং বদ্ধ স্থানে কাজের আগে গ্যাস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়মের অধিকাংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

জানা গেছে, এই প্রকল্পে পাইপ বসানোর কাজ করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাইড্রো চায়না কর্পোরেশন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহে যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি রয়েছে তদারকির অভাব। ফলে সরঞ্জাম থাকলেও অনেক সময় তা সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় চট্টগ্রাম মহানগরীর ‘পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন’ প্রকল্প।

প্রকল্পের আওতায় দৈনিক ১০ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতার একটি পয়ঃশোধনাগার, দৈনিক ৩০০ ঘনমিটার সক্ষমতার একটি সেপটিক বর্জ্য শোধনাগার এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার পয়োনালা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধির চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো মেলেনি। ব্যয় বাড়লেও কাজের গতি বাড়েনি, বরং অনিয়ম, ধীরগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

এরই মধ্যে প্রকল্পের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ফাটল এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে প্রকল্পটির স্বচ্ছতা, গুণগত মান ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

একদিকে সময়সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে, কাজের অগ্রগতি থমকে আছে, আর নিরাপত্তাহীনতায় প্রাণ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। উন্নয়নের নামে এমন অব্যবস্থাপনা শুধু উদ্বেগজনক নয়, তা চরম দায়িত্বহীনতার উদাহরণ।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্প এখন অগ্রগতির চেয়ে বেশি আলোচিত অনিয়ম, ধীরগতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে।

আগ্রাবাদের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে অবহেলা আর গাফিলতির মূল্য দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের জীবন দিয়ে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি