back to top

ঝুঁকিপূর্ণ খননেই জোড়া মৃত্যু: দায় নেবে কে-ওয়াসা না ঠিকাদার?

ওয়াসা প্রকল্পে মাটি ধস: দুই শ্রমিক নিহত

প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:১৫

চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় রাতের আঁধারে ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পে খননকাজ করতে গিয়ে মাটিধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু ও দুইজনের আহত হওয়ার ঘটনা আবারও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রকল্প আছে, কাজ চলছে, কিন্তু শ্রমিকের নিরাপত্তা কোথায়?

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভোর ৪টার দিকে হালিশহর থানাধীন আগ্রাবাদের বি-ফোর এক্সেস রোড এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

আগ্রাবাদ অ্যাকসেস রোডের সিঙ্গাপুর মার্কেটের সামনে পানির পাইপ বসানোর জন্য মাটি কাটার সময় হঠাৎ ধসে পড়ে পাশের মাটি। এতে চারজন শ্রমিক চাপা পড়েন।ওয়াসা

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুইজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা হলেন রাকিব ও তুষার (২২)। তুষারের বাড়ি দিনাজপুর জেলায়, আর রাকিবের বিস্তারিত পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।ওয়াসা

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহত দুজনের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

একই ঘটনায় গুরুতর আহত দুজন চিকিৎসীধীন আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একজনের নাম সাগর ও অপরজন এরশাদ। তাদেরও বিম্তারিত তথ্য তাৎক্ষনিক পাওয়া যায়নি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন জানান, গভীর রাতে খননকাজ চলাকালে এই দুর্ঘটনা ঘটে। চার শ্রমিক মাটির নিচে চাপা পড়েন, পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ওয়াসা সূত্র বলছে, সেখানে ‘ট্রায়াল পিট’ খননের কাজ চলছিল। চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্যুয়ারেজ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই কাজ করা হচ্ছিল এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো কাজটি বাস্তবায়ন করছে। তাদের কাছে দুর্ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে—একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে, যেখানে গভীর খননকাজ চলছে, সেখানে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল কি? শ্রমিকদের জন্য কি ছিল কোনো সাপোর্ট স্ট্রাকচার, সেফটি গিয়ার, বা ঝুঁকি মূল্যায়ন?

নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের খননকাজে মাটি ধস প্রতিরোধে সাপোর্টিং ব্যবস্থা (শোরিং বা স্লোপিং) থাকা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু হতাহতদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা নয়ন, খায়রুল ও মো. শাকিল প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছেন, গভীর রাতে কাজ হলেও সেখানে দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সামান্য ধসই পরিণত হয় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার একই চিত্র। সময় বাঁচাতে বা ব্যয় কমাতে নিরাপত্তা উপেক্ষা করা হয়, আর তার খেসারত দিতে হয় শ্রমিকদের জীবন দিয়ে।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।

তারা নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ওয়াসার পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষায়ই স্পষ্ট—“মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না।” এরপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, চারজনকে হাসপাতালে আনা হলে দুইজনকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং আহত দুজন হাসপাতালের ক্যাজুয়াল্টি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হাসপাতালে শোকের মধ্যেই উত্তেজনা-বিশৃঙ্খলা, আটক ৭
এদিকে নিহতদের মরদেহ হাসপাতালে আনার পর স্বজনদের আহাজারিতে পুরো হাসপাতাল এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। শোকের মধ্যেই নিহত পরিবারগুলোর সদস্যরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। একপর্যায়ে নিহত প্রত্যেক পরিবারের জন্য তিন লাখ টাকা করে দেওয়ার এক পর্যায়ে মৌখিক সমঝোতা হয়।

তবে এক বহিরাগত ব্যক্তি উসকানিমূলক মন্তব্যে মুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ব্যক্তি বলেন, “মারা গেছে তো কী হয়েছে, টাকা দিবে কেন?”ওয়াসা

এ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নিহতদের স্বজনরা। শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, পরে ধাক্কাধাক্কি এবং হাতাহাতি। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে মারামারির সৃষ্টি হলে হাসপাতাল এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয় এবং চিকিৎসাসেবাও কিছু সময়ের জন্য বিঘ্নিত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন। তারা জড়িতদের ছত্রভঙ্গ করেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৭ জনকে আটক করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

আটক ব্যক্তি ও ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে ও জানায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম আশেক।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, তদন্ত ও দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হয়, ততই চাপা পড়ে যায় মূল প্রশ্ন। এই মৃত্যু সত্যিই কি এড়ানো যেত না?

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, শ্রমিকের জীবন তার চেয়ে কম মূল্যবান নয়।

নিরাপত্তাহীনতার এই ধারাবাহিকতা বন্ধ না হলে এমন ‘দুর্ঘটনা’ আসলে অনিবার্য নয়, বরং প্রতিরোধযোগ্য এক ধরনের অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবেই থেকে যাবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আর এসপি