back to top

জনবল সংকটে চাপে আরএনবি, রেলের সম্পদ সুরক্ষায় বাড়ছে ঝুঁকি!

প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:০৮

বাংলাদেশ রেলওয়ের তীব্র জনবল সংকটের মধ্যেই ৪৫.৭৬ শতাংশ শূন্য পদ নিয়েই কাজ করছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা।

দীর্ঘদিন নিয়োগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে দায়িত্ব পালন করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে আরএনবি।

রেলের দুই অঞ্চলে মঞ্জুরীকৃত সদস্য সংখ্যা ৩৩৪৪ জন। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৮১৪ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পদই খালি।

রেলের পূর্বাঞ্চলে ১১টি পদে মঞ্জুরীকৃত ১৯৯২ জন সদস্যের মধ্যে কর্মরত আছেন ১০৬১ জন। শূন্য রয়েছে ৯৩১টি পদ, যা শতকরা হিসেবে ৪৬.৭৬ শতাংশ।

একইভাবে পশ্চিমাঞ্চলে ১৩৫২টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৫৩ জন। এখানে শূন্য ৫৯৯টি পদ, অর্থাৎ ৪৪.৩০ শতাংশ।

নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া বারবার আটকে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে বিদ্যমান সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তাদের কাজের মান ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সূত্র জানায়, দেশের ৪৪টি জেলায় প্রায় ২৯০০ কিলোমিটার (ট্র্যাকসহ প্রায় ৪০০০ কিলোমিটার) রেললাইন পরিচালনা করতে প্রায় ২৮ হাজার জনবল রয়েছে।

এর সঙ্গে রেলের বিভিন্ন স্থাপনা ও মালামাল পাহারা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে আরএনবি। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

লোকবল সংকটের কারণে রেলের হাজার হাজার একর সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল। নিরাপদ রেল ভ্রমণ ও রেলের সম্পদ রক্ষার স্বার্থে দ্রুত আরএনবি সদস্য নিয়োগ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

নানা সমস্যার বিষয়টি স্বীকার করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ডেন্ট মো. জহিরুল ইসলাম ও পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলাম বলেন, “৪৫ শতাংশের অধিক শূন্য পদ নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। যেখানে ৪ জন দরকার সেখানে আমরা ২ জনের বেশি দিতে পারছি না।

যেহেতু রেলের পরিধি অনেক বড় তাই অল্প সংখ্যক লোক দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা সমস্যার পড়ছে মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা। এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা দরকার।”

অপর একটি সূত্র জানায়, ২০২২ সালে আরএনবি সদস্য নিয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল রেলভবন। এর জন্য দুই অঞ্চলে দুটি নিয়োগ কমিটিও করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগবিধির অজুহাতে হঠাৎ সেই কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

২০২০ সালের ৮ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত ডিজি বরাবরে এক পত্রে বলা হয়, “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী রিক্রুইটমেন্ট রুলস ১৯৮৫” অধীনে নিয়োগ/পদোন্নতি কার্যক্রম চলমান রাখার বিষয়ে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ মতামত দিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মতামতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬” রহিত করে “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০১৬” প্রণয়ন করা হয়।

তবে নতুন আইন কার্যকর হলেও পুরোনো বিধিমালা সংশোধন বা রহিত না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে এবং এর আওতায় কার্যক্রম পরিচালনায় আইনগত কোনো বাধা নেই। একই সঙ্গে দ্রুত নতুন বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এই মতামতে ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এমপি, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মইনুল কবির (চ.দা.), যুগ্ম সচিব মো. রফিকুল হাসান, উপসচিব এস এম সাফায়েত হোসেন ও ড্রাফটম্যান সৌমেন পালিত বাবু।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এমআর মনজু বলেন, “আইন অনুযায়ী নিয়োগে কোন বাধা নেই।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে রেলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারতো।

রেলে যে পরিমাণ আরএনবি সদস্য আছে তা অনেক কম, কিন্তু কতিপয় অদক্ষ কর্মকর্তার গাফিলতির ফলে ২ বছরেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এমনকি কমিটিও করতে পারেনি।”

অপর একটি সূত্র জানায়, রেলের ডিজি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ঘরানার লোক, আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পেয়েছিল।

সেই প্রকল্পে পাথর কেলেঙ্কারি সহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে রেলের বিপুল অর্থ লোপাট করার অভিযোগ আছে। অডিট রিপোর্টেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

তিনি বর্তমানেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা এনে রেলকে বেকায়দায় ফেলছেন কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনকে মোবাইলে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “আরএনবি সদস্য নিয়োগ নিয়ে কাজ চলছে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়েছে।

ওখান থেকে ক্লিয়ার হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আশা করছি খুব শীঘ্রই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যাবে।”

সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক শূন্য পদ নিয়ে দেশের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা চলছে চরম ঝুঁকিতে। নিয়োগ জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত পদগুলো পূরণ না হলে রেলের সম্পদ ও যাত্রী নিরাপত্তা—দুটিই বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আর এসপি