চট্টগ্রামে এখন গরম শুধু আবহাওয়ার নয়, জনজীবনেরও। একদিকে তাপদাহের দহন, অন্যদিকে বিদ্যুতের অঘোষিত নির্বাসন। দুইয়ের চাপে কার্যত হাঁসফাঁস করছে বন্দরনগরী।
দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে নগর থেকে গ্রাম, সর্বত্র নেমে এসেছে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর অন্ধকারের এক দীর্ঘ ছায়া। ঘরে ঘরে এখন একটাই আতঙ্ক। কখন আবার নিভে যাবে আলো।
সবচেয়ে করুণ চিত্র এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ঘিরে। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রাক্কালে বই খুলে বসেও তারা যেন লড়ছে আরেক অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে, লোডশেডিং।
পড়ার টেবিলে আলো জ্বলে ওঠার আগেই তা নিভে যায়। ঘামে ভেজা রাত, হাতপাখার বাতাস আর অন্ধকারে দুশ্চিন্তায় কাটছে তাদের প্রস্তুতির সময়।
অনেকের কাছে এই বিদ্যুৎ সংকট এখন কেবল ভোগান্তি নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কার কারণ।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড পর্যন্ত এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে। পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে লোডশেডিং কমানোর অনুরোধ জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কারণ, এই অস্থির পরিস্থিতি যে শুধু দৈনন্দিন জীবনকেই ব্যাহত করছে তা নয়, এটি সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতি ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বিতরণ বিভাগের আওতায় থাকা ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ১০টি বন্ধ।
আরও কয়েকটি কেন্দ্র নামমাত্র উৎপাদনে থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটে সেগুলোর সক্ষমতা প্রায় অকার্যকর।
ফলে কাগজে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ যতই সীমিত দেখানো হোক, বাস্তবে তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও ভয়াবহ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন সেই সক্ষমতার অর্ধেকের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
গত বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট, আর সন্ধ্যায় ২ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ব্যবধানই তৈরি করছে লোডশেডিংয়ের অন্তহীন চক্র।
চাহিদা ছিল ১ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট। অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। ফলে একদিনেই লোডশেডিং করতে হয়েছে ২১০ মেগাওয়াট।
আগের দিনও ছিল ১৭২ মেগাওয়াটের ঘাটতি। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো প্রতিদিনের দুর্ভোগের নির্মম হিসাব।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাউজানের পুরোনো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় অচল। ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের একটি দুই বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণের নামে বন্ধ।
অন্য ইউনিটটিও গ্যাস সংকটে থমকে আছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে। ফলে একসময়ের নির্ভরযোগ্য এই কেন্দ্র এখন পরিণত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকটের প্রতীকে।
জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে জোডিয়াক পাওয়ার, জুলদা-২, জুলদা-৩ এবং শিকলবাহা পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট।
প্রতিটি বন্ধ কেন্দ্র যেন চট্টগ্রামের অন্ধকারকে আরও দীর্ঘ করছে। উৎপাদনের এই ঘাটতি সরাসরি এসে আঘাত হানছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
স্বস্তির আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও এখন টালমাটাল। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে।
আর বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদন কার্যত অর্ধেকে নেমে এসেছে। কয়লা সংকটে এই কেন্দ্র থেকে এখন মিলছে মাত্র ৬১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা সক্ষমতার তুলনায় হতাশাজনক।
এদিকে গরম যত বাড়ছে, বিদ্যুতের চাহিদাও তত বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। উপরন্তু কারিগরি ত্রুটিতে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। নগরীর ষোলশহর ২ নং গেইট এলাকার গৃহিণী আফিয়া বেগমের দিন কাটছে আতঙ্কে। কখন বিদ্যুৎ যাবে, সেই উৎকণ্ঠায় তিনি যেন সারাক্ষণ প্রস্তুত।
গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, হাতপাখা চালাতে চালাতে হাত ব্যথা হয়ে গেছে। সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, রাতে ঘুমও যেন বিলাসিতা।
পটিয়া পৌরসদরের ২নং ওয়ার্ড খাস্তগীর পাড়ার সুমি দাশের ঘরেও একই গল্প। দিনে ১৫ থেকে ২০ বার বিদ্যুৎ যায়-আসে।
শিশুদের নিয়ে তার সংগ্রাম যেন থামছেই না। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎহীন ঘরে শিশুদের কান্না আর মায়ের অসহায়তা। এ যেন এক নীরব দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি।
বোয়ালখালীর প্রান্তিক পাহাড়ি এলাকাতেও অবস্থা ভয়াবহ। দাসর দিঘী এলাকায় দিনের বেলায় বিদ্যুৎ পাওয়া এখন প্রায় অলৌকিক ঘটনা। একবার চলে গেলে চার ঘণ্টাতেও ফিরে আসে না। সেখানে বিদ্যুৎ যেন প্রয়োজনীয় সেবা নয়, অনিশ্চিত এক সৌভাগ্য।
চট্টগ্রামের মানুষ এখন কেবল গরমের সঙ্গে লড়ছে না; তারা লড়ছে অব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সংকট ও অবহেলার সঙ্গেও। বিদ্যুতের এই অস্থিরতা শুধু অন্ধকারই নামিয়ে আনছে না, তা মানুষের স্বাভাবিক জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে।
তীব্র গরম, জ্বালানি সংকট, অচল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার চাপে চট্টগ্রাম এখন এক গভীর বিদ্যুৎ সংকটের মুখে। এর সরাসরি খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অন্ধকারে ডুবে থাকা এই জনপদে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



