back to top

অন্ধকারে নগরজীবন বিপর্যস্ত: গরমে বাড়ছে দুর্ভোগ!

জ্বালানি সংকটে ৬ কেন্দ্র অচল

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৪০

জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আঘাত হেনেছে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে চট্টগ্রামের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নগরীতে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি।

দিনের বড় অংশজুড়ে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। নগরজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে।

গেল ১৫ এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, সকাল ও সন্ধ্যা—দুই সময়েই বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে।

সকাল ১১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৮৪ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যা ৭টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪শ ৩২ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াটে।

কিন্তু সরবরাহ ছিল যথাক্রমে ১,০৯৫.৯৬ মেগাওয়াট এবং ১,৪৭০ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল তুলনামূলক কম, ফলে লোডশেডিং দাঁড়ায় ২৮১ মেগাওয়াটের বেশি।

অন্য হিসাবে দেখা যায়, মোট চাহিদা ১ হাজার ৩শ ৮৪ দশমিক ৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৯৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়েছে ২শ ৮৮ দশমিক ১৩ মেগাওয়াট, আর লোডশেডিং দেখানো হয়েছে ১১১ দশমিক ৯ মেগাওয়াট।

একের পর এক অচল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, চাপ বাড়ছে সিস্টেমে
জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি কেন্দ্র প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে তিনটিই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের। এ কেন্দ্রের দুই, তিন ও পাঁচ নম্বর ইউনিট প্রায় অচল হয়ে গেছে জ্বালানি সংকটে।

জানা গেছে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ২ (৪৬ মেগাওয়াট), ৩ (৫০ মেগাওয়াট) এবং ৫ (৫০ মেগাওয়াট) বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই-৪ (৫০ মেগাওয়াট) থেকে উৎপাদন হয়েছে ৮০ মেগাওয়াট।

এছাড়াও ২১০ মেগাওয়ার্ট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রাউজান-১ ও রাউজান-২ এখন বন্ধ রয়েছে। অন্যটি হলো জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

চালু কেন্দ্রেও অস্থির উৎপাদন
চালু থাকা কেন্দ্রগুলো থেকেও নিয়মিত ও স্থিতিশীল উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন হঠাৎ কমে গেছে। এরমধ্যে আনোয়ারা ইউনাইটেডে ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

একইভাবে এনলিমা ১১৬ মেগাওয়াট কেন্দ্রে সকাল ১০০ মেগাওয়াট হলেও সন্ধ্যায় নেমে আসে ১৭ মেগাওয়াটে। এছাড়াও দোহাজারী কেন্দ্রে ১০০ মেগাওয়াটের জায়গায় উৎপাদন হচ্ছে ৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

এছাড়াও সূত্র বলছে, আনোয়ারা ইউনাইটেড ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ৩২ মেগাওয়াট এবং মিরসরাইয়ের বিআর পাওয়ারে ৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৮০ মেগাওয়াট, বারাকা শিকলবাহা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৮৫ মেগাওয়াট, এনার্জিপ্যাক ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৭৫ মেগাওয়াট, ইউনাইটেড পাওয়ার ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ৮ মেগাওয়াট।

তবে কিছু বড় কেন্দ্র তুলনামূলক বেশি উৎপাদন করছে, যেমন-বাঁশখালী উপজেলায় অবস্থিত এস আলম কেন্দ্রে ৯০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। একইভাবে পটিয়া-কর্ণফুলির শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪২৭ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়ি কেন্দ্রে ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

এছাড়াও বারাকা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৫৯ মেগাওয়াট, বারাকা কর্ণফুলী ১১০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ১১১ মেগাওয়াট, জুলধা-২ ও জুলধা-৩ কেন্দ্র থেকে ২৪ মেগাওয়াট করে, কাপ্তাই সোলার কেন্দ্র থেকে ১ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট এবং কাপ্তাই-১ কেন্দ্র থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে।

কেইপিজেড কেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আরপিসিএল থেকে ৩৩ মেগাওয়াট, টেকনাফ সোলার কেন্দ্র থেকে ১৭ দশমিক ৪৪ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজার উইন্ড প্ল্যান্ট থেকে সকাল ও সন্ধ্যা উভয় সময়েই ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

নগরজুড়ে দুর্ভোগ, গরমে নাজেহাল মানুষ
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চট্টগ্রামের চকবাজার, হালিশহর, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, কাজির দেউড়ি, লাভলেইন, জুবিলী রোড, টেরিবাজার, হাজারী গলি, আগ্রাবাদ ও বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক এলাকায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত ফিরে আসছে না।

ফলে-প্রচণ্ড গরমে বাসাবাড়িতে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সংগ্রহে ব্যবহৃত পানির পাম্প চালাতে না পারায় পানি সংকট দেখা দিচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা
বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত গরম বাড়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। কিন্তু জ্বালানি সংকট কাটছে না, বরং গ্যাসের চাপ কম এবং তেলের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকট কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অফিস সময় কমানো ও শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকারি নির্দেশনাগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুৎ সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ যা বলছে
চট্টগ্রাম পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহমিদা জামান জানান, গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের ঘাটতিও উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, লোডশেডিং পরিস্থিতি সরবরাহের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করছে এবং আপাতত দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম।

এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে চট্টগ্রামে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একাধিক কেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও ক্রমেই বাড়ছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি