back to top

রক্তাক্ত চট্টগ্রাম-শহরজুড়ে ভয়: ১৪ থেকে ২২-এই বয়সেই ‘কিলিং মিশন’

পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য যুদ্ধেও কিশোরদের হাতে অস্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:২৩

চট্টগ্রাম নগরী যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক আতঙ্কের জনপদে। বয়স মাত্র ১৪ থেকে ২২—এই কিশোর-তরুণরাই এখন জড়িয়ে পড়ছে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দাঙ্গা, এমনকি ‘কিলিং মিশন’-এর মতো ভয়ংকর অপরাধে।

পাড়া-মহল্লায় তাদের দাপটে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যেন একের পর এক রক্তাক্ত বার্তা দিচ্ছে।

গেল ৪ এপ্রিল রাতে বাকলিয়া থানার মিয়াখান নগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে শুরু হয় প্রকাশ্য গোলাগুলি।

পিস্তল ও শটগানের এলোপাতাড়ি গুলিতে ১৩ বছরের শিশু ফাহিম দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হন আরও চারজন। ঘটনাটি নগরবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর আহত শিশুটির বাবা সোলাইমান বাদশা বাদী হয়ে মোরশেদ খান, শওকত, ফারুক, হোসেনসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মোরশেদ খান ও আবদুস সোবহান। তাদের ছত্রছায়ায় কিশোররা এখন আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে।

এর মাত্র দুই দিন পর, ৬ এপ্রিল কোতোয়ালি থানার কোরবানীগঞ্জ এলাকায় ঘটে আরেকটি নৃশংস ঘটনা। যুবদল কর্মী মিনহাজকে কুপিয়ে তার কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা।

এরপর চকবাজার থানার মৌসুমী আবাসিক এলাকায় সংঘর্ষের জেরে বিএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে ৮ তলা ভবনের লিফটের গর্তে ফেলে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে পাঁচজনই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর এক অপরাধচক্রের প্রতিফলন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের ১৬টি থানায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ কিশোর অপরাধীর তালিকা রয়েছে। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। তালিকার বাইরে থাকা অনেক কিশোরও জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে।

সন্ধ্যার পর নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, চকবাজার, খুলশি, ফয়েস লেক, আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাদক বেচাকেনা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ছিনতাই, ক্লাব ও আড্ডা নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই তাদের আধিপত্য। বিশেষ করে ইয়াবা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অনেক কিশোর।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই গ্যাংগুলোর অনেকেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। কেউ দলীয় নাম ব্যবহার করছে, কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে কাজ করছে। এমনকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এদের শনাক্ত করা। কারণ অধিকাংশই অপরিচিত মুখ এবং নিজ নিজ এলাকায় থেকেই অপরাধ পরিচালনা করছে।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এই ভয়ংকর প্রবণতা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ‘অপারেশন এস ড্রাইভ’ শুরু হয়।

দেড় মাসে ২০০-এর বেশি সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধ থামছে না। বরং নতুন নতুন কিশোর যুক্ত হচ্ছে এই চক্রে।

সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন-শুধু অভিযান কি যথেষ্ট? কারণ, বাস্তবতা বলছে-চট্টগ্রাম এখন শুধু অপরাধের শহর নয়, বরং কিশোর সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে, ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে আরও রক্ত দিয়ে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি