চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করে থাকা একটি পুরোনো কেমিক্যাল ট্যাংকার হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরান-সংযোগ এবং বাংলাদেশি এক প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
‘মেমেই’ নামের প্রায় ৬১ কোটি টাকা মূল্যের জাহাজটি ভাঙার জন্য কিনেছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এসএন কর্পোরেশন।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী, যিনি ব্যবসায়িক অঙ্গনে ‘ডিসকো শওকত’ নামে পরিচিত।
কিন্তু জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছানোর মাত্র ছয় দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় স্থান পায়। অভিযোগ, এটি ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। শুধু জাহাজ নয়, এর মালিক প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—যে কোম্পানির বিরুদ্ধে ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত ছিল, তাদের কাছ থেকেই কেন জাহাজ কিনল এসএন কর্পোরেশন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে আরও কিছু পুরোনো তথ্য, যেগুলো আবারও আলোচনায় এনেছে ‘ডিসকো শওকত’ এবং তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে।
সীতাকুণ্ডে ভাঙার কথা ছিল, আটকে গেল বন্দরে:
‘মেমেই’ (আইএমও: ৯১৩৩০৮২) নামের ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতার কেমিক্যাল ও অয়েল ট্যাংকারটি গত ২২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হওয়া জাহাজটির গন্তব্য ছিল সীতাকুণ্ডে এসএন কর্পোরেশনের শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।
১৯৯৭ সালে নির্মিত পালাউ-পতাকাবাহী জাহাজটির লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টনেজ ৯ হাজার ৮৭৭ দশমিক ১ টন। আন্তর্জাতিক জাহাজ রিসাইক্লিং বাজারের হিসাবে এর স্ক্র্যাপ মূল্য প্রায় ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার সমান।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
ছয় দিনের ব্যবধানে বদলে যায় পুরো চিত্র :
গত ২৮ মে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) ‘মেমেই’কে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জাহাজটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির অংশ হিসেবে নির্বাহী আদেশ ১৩৮৪৬-এর আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ফলে যে জাহাজটি ভাঙার জন্য কেনা হয়েছিল, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্দরে আটকে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাহাজটিকে মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুধু জাহাজ নয়, নিষেধাজ্ঞায় মালিক কোম্পানিও:
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় শুধু ‘মেমেই’ নয়, এর নিবন্ধিত মালিক হংকংভিত্তিক এভার শাইনিং লিমিটেডও স্থান পেয়েছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ ‘ফ্লোরা’ ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ১৪ বার ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহন করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, এভার শাইনিং লিমিটেড জেনেশুনে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল খাত সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যে অংশ নিয়েছে। সে কারণেই প্রতিষ্ঠানটির জাহাজগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থাৎ ‘মেমেই’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং একটি বৃহত্তর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জানা ছিল না, নাকি জেনেও ঝুঁকি নেওয়া হয়েছিল?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পে জাহাজ কেনাবেচার আগে মালিকানা, বাণিজ্যিক ইতিহাস, নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কার্যক্রম যাচাই করা প্রতিষ্ঠিত চর্চা।
বিশেষ করে কোটি কোটি টাকার জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে এ ধরনের যাচাই প্রায় বাধ্যতামূলক বলেই বিবেচিত হয়।
তাহলে কি এসএন কর্পোরেশন এভার শাইনিং লিমিটেড সম্পর্কে কিছুই জানত না?
নাকি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য থাকার পরও জাহাজটি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো মেলেনি। তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শিপিং খাত ও ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কেন আবার সামনে এল ‘ডিসকো শওকত’ নামটি:
‘মেমেই’ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এসএন কর্পোরেশনের মালিক শওকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ‘ডিসকো শওকত’ নামেই বেশি পরিচিত।
বন্দরনির্ভর ব্যবসা, শিপব্রেকিং শিল্প এবং ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ী বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান।
নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ কেনার ঘটনায় তার প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসার পর ব্যবসায়িক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—এটি কি কেবল একটি ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো বাণিজ্যিক বাস্তবতা?
পুরোনো বিতর্কের ছায়াও ফিরে এসেছে:
‘মেমেই’ কাণ্ড সামনে আসার পর এসএন কর্পোরেশনকে ঘিরে অতীতের কিছু প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে খোলা কয়েকটি ঋণপত্রের সুবিধাভোগী ছিল একই ঠিকানায় নিবন্ধিত তিনটি বিদেশি কোম্পানি।
পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এসব লেনদেনকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। সেই অনুসন্ধানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও ব্যবসায়িক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
‘মেমেই’কে ঘিরে নতুন বিতর্ক সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকেও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি জাহাজ, নাকি আরও বড় কোনো গল্প?
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মেমেই’ আপাতদৃষ্টিতে একটি বাতিল জাহাজ। কিন্তু এর চারপাশে জমা হওয়া তথ্যগুলো অন্য এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্যের অভিযোগ, অফশোর মালিকানার জটিলতা এবং বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন।
একটি জাহাজ হয়তো শেষ পর্যন্ত ফেরত চলে যাবে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো রেখে যাচ্ছে, সেগুলো এত সহজে বিদায় নেওয়ার নয়।
আর সেই কারণেই ‘মেমেই’ এখন কেবল একটি জাহাজের নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে ‘ডিসকো শওকত’-এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংযোগ নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া এক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



