ট্যাংকলরি এসেছে—রেজিস্টারে তার সময় লেখা হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষী সই করেছেন। জ্বালানি গ্রহণের নথিতে কর্মকর্তাদের অনুমোদনও আছে। কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ খুলতেই বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সত্য—চারটি ট্যাংকলরির একটিও ঢোকেনি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে।
অথচ সেই “অদৃশ্য” গাড়িগুলোর নামে দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার লিটারের বেশি জেট এ-১ জ্বালানি গ্রহণ।
পরে কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা আর ভুয়া “পরিবহন ক্ষতি” দেখিয়ে কোটি টাকার বিমান জ্বালানি গায়েবের চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের অন্যতম সুরক্ষিত ব্যবস্থার ভেতরেই এভাবে গড়ে ওঠে সংঘবদ্ধ তেলচোর চক্র।
পদ্মা অয়েল পিএলসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য।
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপকসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিপোতে কর্মরত আরও আটজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত; নথি জালিয়াতি, ভুয়া হিসাব, মিথ্যা ডিপ রেকর্ড এবং মজুত তথ্য বিকৃত করে তেল আত্মসাতের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটি জাতীয় শীর্ষ এক দৈনিক পত্রিকার হাতে এসেছে। এরপর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা অয়েলের চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে ট্যাংকারে করে জেট এ-১ তেল প্রথমে পাঠানো হয় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে।
সেখান থেকে চুক্তিবদ্ধ ট্যাংকলরির মাধ্যমে প্রতিদিন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে সরবরাহ করা হয় এই জ্বালানি।
এই পরিবহন ব্যবস্থাকে এত দিন প্রায় ‘অভেদ্য’ বলে ধরা হতো। কারণ, পুরো প্রক্রিয়ায় রয়েছে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা—গেট রেজিস্টার, সিসিটিভি নজরদারি, ডিপ বা গভীরতা পরিমাপ, তাপমাত্রা ও ঘনত্ব যাচাই, মজুত রেকর্ড, গ্রহণ সনদ—সবকিছু আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকে।
কিন্তু তদন্ত বলছে, সেই ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই ঢুকে পড়েছিল জালিয়াত চক্র।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মার্চ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের মধ্যে চারটি ট্যাংকলরি গোদনাইল ডিপো থেকে জেট এ-১ বোঝাই করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
গাড়িগুলো চারটি ভিন্ন কোম্পানির। পরে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর গেট রেজিস্টারে উল্লেখ করা হয়, সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিট থেকে ৭টা ২৭ মিনিটের মধ্যে ট্যাংকলরিগুলো ডিপোতে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু তদন্ত কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পায়। ফুটেজে দেখা যায়, ওই সময় কোনো ট্যাংকলরিই ডিপোতে ঢোকেনি।
এরপর জিজ্ঞাসাবাদে নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ও সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. শওকত হোসেন স্বীকার করেন, ডিপো ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হকের নির্দেশে গাড়ি না ঢুকলেও রেজিস্টারে প্রবেশ দেখানো হয়েছিল।
শুধু গেট রেজিস্টারেই নয়, জ্বালানি গ্রহণের মূল নথিতেও একই ধরনের জালিয়াতি করা হয়।
চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন এভিয়েশন ফুয়েল স্টক ট্রান্সফার অ্যাডভাইস নোট ও রিলিজ সার্টিফিকেটে সই করেন।
সেখানে তিনি তেলের গভীরতা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বও উল্লেখ করেন। অথচ তদন্তে দেখা যায়, বাস্তবে কোনো ট্যাংকলরিই ডিপোতে আসেনি।
ডিপোর চেকার আকতার কামালও গাড়ি না ঢুকলেও ডিপ নেওয়ার তথ্য দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন কাগজপত্রে কোনো অসংগতি ধরা না পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে ট্যাংকের মজুত হিসাবেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চারটি ট্যাংকলরি থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ৭ নম্বর ট্যাংকে জেট এ-১ গ্রহণ দেখানো হয়েছিল। সেই হিসাবে ট্যাংকে থাকার কথা ছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৩ লিটার জ্বালানি।
কিন্তু পরদিন ১২ মার্চের ট্যাংক রিলিজ সার্টিফিকেটে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৬ লিটার। দুই হিসাবের পার্থক্য দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৭২৭ লিটার।
তদন্ত কমিটি পরে ট্যাংক স্টক লেজার রেজিস্টার (টিএসএলআর) পরীক্ষা করে আরও গুরুতর তথ্য পায়।
সেখানে কোনো ধরনের পরিচালন কার্যক্রম ছাড়াই ৭৩ হাজার ৮৯৫ লিটার তেলকে “পরিবহন ক্ষতি” হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এই গরমিল আড়াল করতেই রেকর্ডে কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা ও ভুয়া হিসাব দেখানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল আত্মসাতের পর মজুত রেকর্ড সমন্বয় করা।
প্রতিবেদনে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে পুরো ঘটনার “মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য, ট্যাংক স্টক লেজার নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি সহযোগীদের নিয়ে ৭২ হাজার ১৩২ লিটার জেট এ-১ আত্মসাতের অপচেষ্টা করেন।
তদন্তে আরও বলা হয়, ছমীর উদ্দিন ও আকতার কামাল জালিয়াতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।
আর সিকিউরিটি সুপারভাইজার শওকত হোসেন ও নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ব্যবস্থাপকের নির্দেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন।
ঘটনার পর সাইদুল হক, ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইদুল হক। তাঁর দাবি, “অন্য কর্মকর্তারা এ কাজ করেছেন। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।”
অন্যদিকে ছমীর উদ্দিন তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, চারটি ট্যাংকলরি ডিপোতে এসেছিল এবং তিনি তেল গ্রহণ করেছিলেন। যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যকে “ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র- প্র. আলো।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, এ ঘটনায় বিপিসির পক্ষ থেকেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, তদন্তে তেল গায়েব হওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে।
এখন খতিয়ে দেখা হবে, গায়েব হওয়া জ্বালানি কোথায় গেছে এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত।



