back to top

১০৯ কোটি টাকা কি আমি একা খেয়েছি?

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ০৯:৪৫

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী অঙ্গনে যেন হঠাৎ নেমে এসেছে অদৃশ্য এক আতঙ্ক। ব্যাংকঋণের বোঝা, আদালতের কঠোর অবস্থান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আর জেল আতঙ্ক—সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এখন নূরজাহান গ্রুপ।

একসময় শিল্পবাণিজ্যের পরিচিত নাম হিসেবে পরিচিত এই গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এবার আদালতের কঠোর পদক্ষেপ নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে আর্থিক খাতেও।

প্রায় ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে রূপালী ব্যাংক পিএলসির দায়ের করা অর্থঋণ জারি মামলায় মেসার্স নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখার আল জাবেরসহ চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পাঁচ মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের এ আদেশের পর ব্যবসায়ী মহলে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের ব্যাংক খাতের ভয়ংকর খেলাপি ঋণের বিস্তার কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত-১–এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন এ আদেশ দেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. এরশাদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নির্দেশনা অমান্য, ঋণ পরিশোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া এবং ধারাবাহিক অনুপস্থিতির কারণেই আদালত এ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

আদালত সূত্র বলছে, ২০১৬ সালে দায়ের হওয়া অর্থঋণ মামলা নম্বর ৩৭৩/২০১৬–এর ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থঋণ জারি মামলা নম্বর ৫৪/২০২৬ পরিচালিত হচ্ছে। মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই আদালত রূপালী ব্যাংকের পক্ষে ডিক্রি দেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।

কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তরা ঋণ পরিশোধে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেননি।

নথি অনুযায়ী, মূল ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। কিন্তু বছরের পর বছর সুদ জমতে জমতে সেই অঙ্ক ভয়ংকর রূপ নেয়।

২০১৬ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২ শতাংশ হারে সরল সুদ যোগ হয়ে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।

আবগারি শুল্ক, মামলা খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে মোট দাবি গিয়ে পৌঁছায় ১০৯ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায়।

অথচ এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে বর্তমান নিট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

মামলায় নূরজাহান গ্রুপের একাধিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মোট ছয়জনকে দায়ী করা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পাঁচ মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ কার্যকর করা হয়েছে।

আদালতের আদেশে যাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে তাঁরা হলেন—মেসার্স নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখার আল জাবের, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহিম, মেসার্স জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান এবং মেসার্স নূরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন।

তবে মেসার্স মাররিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমদের বিরুদ্ধে এ পর্যায়ে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আটকাদেশ জারি হয়নি।

মামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখার আল জাবের গণমাধ্যমকে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “১০৯ কোটি টাকা কি আমি একা খেয়েছি?

ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ না দিয়ে এভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”

তাঁর দাবি, বাজার অস্থিরতা, শিল্প খাতে মন্দা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়ে। সূত্র- সি পোস্ট

তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযুক্তরা আদালতের নোটিশ পেয়েও হাজির হননি এবং পাওনা পরিশোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি।

রূপালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা এবং ইচ্ছাকৃত গড়িমসির কারণে ডিক্রি বাস্তবায়ন কার্যত থমকে যায়।

পরে ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩–এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দেওয়ানি আটকাদেশ চেয়ে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করেন।

আইনজীবীরা বলছেন, অর্থঋণ আদালত সাধারণত সব ধরনের সুযোগ দেওয়ার পরই এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়।

আদালতের নির্দেশ অমান্য, ঋণ পরিশোধে অনীহা এবং সম্পদ থেকে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেলে আদালত দেওয়ানি আটকাদেশের মতো পদক্ষেপ নেয়।

একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “ব্যাংকঋণ নিয়ে বছরের পর বছর খেলাপি থাকার সংস্কৃতি ভয়ংকর আকার নিয়েছে। আদালত এখন সেই বার্তা দিচ্ছেন যে, ঋণখেলাপিদের জন্য আর সহজ পথ খোলা থাকবে না।”

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে এ ঘটনায় তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে খেলাপি ঋণ আজ ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে।

এদিকে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ফলে নূরজাহান গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন জেল আতঙ্ক আরও তীব্র হচ্ছে বলে ব্যবসায়ী অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি