দেয়ালে আঁকা কিছু গ্রাফিতি। কয়েকটি রঙের আঁচড়। কিছু স্লোগান। সেখান থেকেই চট্টগ্রাম নগরীর রাজনীতি হঠাৎ যেন বিস্ফোরণের মুখে দাঁড়িয়ে গেছে।
টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার—পুরো এলাকা এখন টানটান উত্তেজনায় থমথমে। দেয়ালে লেখা ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ স্লোগান ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিএনপির নেতাকর্মীরা।
গতকাল রোববার রাতজুড়ে চলে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, রাজনৈতিক বিষোদ্গার ও শক্তি প্রদর্শন।
সোমবার সকালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল। টাইগারপাস, লালখান বাজার, ওয়াসা মোড়, জিইসি—সবখানেই সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চাপা আতঙ্ক।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—কেবল গ্রাফিতি মোছা নিয়েই কি এই বিস্ফোরণ? নাকি ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর রাজনৈতিক মালিকানা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন ক্ষমতার লড়াই?
দেয়াল থেকে রাজপথে :
বিতর্কের সূত্রপাত নগরের বিভিন্ন এলাকায় জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে যাওয়ার অভিযোগে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কয়েকটি দেয়ালের ছবি, যেখানে পুরোনো গ্রাফিতির ওপর নতুন রঙ বা বিজ্ঞাপনসদৃশ লেখা দেখা যায়।
এনসিপির অভিযোগ, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে ‘জুলাইয়ের স্মৃতি’ মুছে ফেলার চেষ্টা। আর এর পেছনে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
রোববার রাত ৯টার দিকে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। নগর ভবনের প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। পরে সেখানে রংতুলিতে লেখা হয়—‘জুলাইয়ের গাদ্দার, হুঁশিয়ার সাবধান।’
এরপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে বড় করে লেখা হয়—‘শাহাদাত ডাক্তার, জুলাইয়ের গাদ্দার।’ নগরজুড়ে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সেই ছবি।
মেয়রকে সরাসরি আক্রমণ :
এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন সরাসরি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে নিশানা করে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।
তিনি বলেন,‘বর্তমান মেয়র হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র। কিন্তু উনার ব্রেনের মেয়াদ চলে গেছে সেটা আমরা জানতাম না। সে কীভাবে জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে লিখে দেয়, বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন।’
আরিফ অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলা হচ্ছে। এমনকি বিপ্লব উদ্যান দখল করে সেখানে চারতলা মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আবারও জুলাইয়ের গ্রাফিতি অংকন করব। মেয়রকে বলতে চাই, আপনার মেয়াদ শেষ, আপনি নির্বাচন দিয়ে চলে যান। হাসিনার মতো বসে থাকবেন না।’ এনসিপির বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সুর।
পাল্টা বিস্ফোরণ মেয়রের :
রবিবার রাতেই পাল্টা অবস্থানে যান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, গ্রাফিতি মুছে ফেলার কোনো নির্দেশ তিনি দেননি।
তাঁর দাবি, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিয়মিত পোস্টার অপসারণ করতে গিয়ে কিছু গ্রাফিতি ঢেকে ফেলেছে। কিন্তু বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ‘জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা’র ব্যাখ্যা।
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে প্রথম শহিদ ওয়াসিম আকরাম আমারই একজন অনুসারী।’
মেয়র দাবি করেন, আন্দোলনের সময় তাঁর বাসায় হামলা হয়েছে, ১৬টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বৃদ্ধ মাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তাঁর ভাষায়,‘এর চাইতে বেশি সাফারার জুলাই-আগস্টে আর কেউ হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, নগরের অধিকাংশ গ্রাফিতিই তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে করা হয়েছিল। আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে আবারও নান্দনিকভাবে সেগুলো আঁকার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে একই সঙ্গে এনসিপির নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে মেয়র বলেন, ‘সে এই শহরকে উত্তপ্ত করতে চায়। রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছে।’
রাস্তায় নামল পুলিশ :
রাতভর উত্তেজনার পর সোমবার সকালে কঠোর অবস্থানে যায় প্রশাসন। সিএমপি কমিশনার মো. শওকত আলীর স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৮ মে থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল ও সভা নিষিদ্ধ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারার ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সতর্ক অবস্থানে থাকা পুলিশ সদস্যদের দেখা যায় টাইগারপাস, লালখান বাজার, ওয়াসা মোড় ও জিইসি এলাকায়।
সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।’
দেয়ালের লড়াই, আসলে কার?
চট্টগ্রামের এই সংঘাত কেবল দেয়াললেখা বা গ্রাফিতি ঘিরে নয়—এর গভীরে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতীক দখলের লড়াই।
জুলাই অভ্যুত্থান এখন শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বৈধতার নতুন ভাষা।
কে সেই আন্দোলনের প্রকৃত ধারক, কে ‘বিশ্বাসঘাতক’, আর কে ‘চেতনার রক্ষক’—তা নিয়েই শুরু হয়েছে প্রকাশ্য সংঘাত।
এনসিপি যেখানে নিজেদের জুলাইয়ের ‘আসল উত্তরসূরি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, সেখানে বিএনপির ঘনিষ্ঠ মেয়র শাহাদাত হোসেনও একই আন্দোলনের অংশীদারত্ব দাবি করছেন।
ফলে দেয়ালে মুছে যাওয়া কয়েকটি গ্রাফিতি এখন চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আর প্রশাসনের কড়া অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই উত্তাপ কেবল দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই; তা যেকোনো সময় রাজপথে বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



