back to top

চট্টগ্রামে একের পর এক শিশু নির্যাতন: ধারাবাহিক ঘটনায় ক্ষোভ-আতঙ্ক!

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ০৫:২৭

একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি। কোথাও চার বছরের শিশু, কোথাও সাত বছরের শিশু, আবার কোথাও দুই বোনকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ।

মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় শিশু নির্যাতনের একের পর এক ঘটনায় আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা এখন চরমে। নগরবাসীর প্রশ্ন—পরিচিত মানুষ, পরিচিত পরিবেশ, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও যদি শিশুরা নিরাপদ না থাকে, তবে তারা কোথায় নিরাপদ?

শুধু অপরাধের ভয়াবহতাই নয়, ঘটনাগুলোর পর জনরোষের বিস্ফোরণও ছিল তীব্র। কোথাও অভিযুক্তকে গণপিটুনি, কোথাও পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, আবার কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ।

বাকলিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুড়তে হয়েছে পুলিশকে।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে শিশু নির্যাতনের ধারাবাহিক এসব ঘটনা যেন সমাজের গভীরে জমে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও সামাজিক দায়হীনতার নির্মম চিত্র সামনে এনে দিয়েছে।

নগরের বাকলিয়া, চান্দগাঁও, খুলশি, ডবলমুরিং ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

তবে শিশু অধিকারকর্মী ও সমাজবিশ্লেষকদের মতে, এত অল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে শিশুদের বিরুদ্ধে এমন সহিংসতা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে শিশুদের বিরুদ্ধে এমন সহিংসতার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হয়েছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধের বিচারহীনতা এবং পারিবারিক সচেতনতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে চান্দগাঁও থানার সিঅ্যান্ডবি টেকবাজার এলাকায়। চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ৫৫ বছর বয়সী মুদি দোকানি আশফাকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

পুলিশ জানায়, শিশুটির পরিবার নিয়মিত ওই দোকান থেকে কেনাকাটা করত। গত ১৫ মে শিশুটিকে একা পেয়ে দোকানের ভেতরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ।

বিষয়টি শিশুটি পরিবারের সদস্যদের জানালেও সামাজিক সংকোচ ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিবার প্রথমে ঘটনাটি গোপন রাখে।

পরে শুক্রবার বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। রাতে মামলা হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুর হোসেন মামুন বলেন, পরিবারের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

একই রাতে খুলশি থানার আমবাগান এলাকায় ১০ ও ৬ বছর বয়সী দুই বোনকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আবদুল বাতেন নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনাটি ঘটে খুলশীর আবহাওয়া অফিসসংলগ্ন একটি মাদ্রাসায়। অভিযুক্তের বাড়ি কুমিল্লায়। স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনায় বিক্ষোভ করেন।

খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, শিক্ষকতার সুবাদে ওই এলাকায় বসবাস করতেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। ভুক্তভোগী দুই শিশুরও শিক্ষক ছিলেন তিনি। অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

শুক্রবার দুপুরে ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এহসান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে মারধর করেন।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাধা দেয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

একই দিন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোহাম্মদনগর এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মোহাম্মদ হাসান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানায়, ১০ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বাকলিয়া এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ ঘটনায় ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

একাধিক ঘটনায় অভিযুক্তরা ভুক্তভোগী পরিবারের পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা এখন শুধু বাইরের নয়, পরিচিত পরিবেশের মধ্যেও বড় হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজব্যবস্থার নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি