বিদেশে বসে ‘বড় সাজ্জাদের’ নিয়ন্ত্রণ, নগরে রায়হানের রক্তাক্ত তাণ্ডব!

প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬ ২৩:১৭

চট্টগ্রাম নগরের রাত যেন ধীরে ধীরে বন্দুকের নলের ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছিল। অন্ধকার নামলেই আতঙ্কে কেঁপে উঠত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা আর সাধারণ মানুষের জীবন।

কোথাও চাঁদার দাবিতে গুলি, কোথাও প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, আবার কোথাও হত্যার পর হত্যার অভিযোগ। সবকিছুর পেছনে বারবার উঠে আসছিল একই নাম, ‘বড় সাজ্জাদ’ ও তাঁর অনুসারী রায়হান।

বিদেশে বসে একজন নিয়ন্ত্রণ দিচ্ছেন পুরো নেটওয়ার্ক, আর নগরের অলিগলিতে অন্যজন ছড়াচ্ছেন রক্তাক্ত ত্রাস।

অবশেষে সেই ভয়ংকর সন্ত্রাসচক্রের দুই সদস্যকে অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল, তাজা গুলি ও শটগানের কার্তুজ।

পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা শুধু অস্ত্র বহনই করতেন না, বরং চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক আলোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও সরাসরি জড়িত ছিলেন।

শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে চান্দগাঁও থানার পুরোনো চান্দগাঁও এলাকার পাঠানিয়া গোদা গোলাম আলী নাজির সড়কের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। শনিবার সিএমপির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন রাউজান উপজেলার আঁধারমানিক এলাকার মো. শুভ (২২) ও কদলপুর শমসের পাড়া এলাকার মো. সুমন (৩৩)।

ডিবি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি (উত্তর) বিভাগের একটি বিশেষ দল ওই বাসায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় শুভর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলিভর্তি ম্যাগাজিন এবং ১৫টি শটগানের কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে সুমনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় আরেকটি বিদেশি পিস্তল, সাতটি গুলিভর্তি ম্যাগাজিন ও একটি খালি ম্যাগাজিন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন অস্ত্র নিজেদের কাছে থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

একই সঙ্গে তাঁরা বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের নির্দেশে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

পুলিশ বলছে, নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় রাজু নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ।

তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হয় চাঁদাবাজি, দখল, গুলি ও হত্যার মতো ভয়ংকর কর্মকাণ্ড। আর মাঠপর্যায়ে সেই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে ভয়ংকর মুখ হয়ে ওঠেন রায়হান।

বছরখানেক আগে জামিনে বেরিয়ে এসে রায়হান যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

অভিযোগ আছে, তুচ্ছ বিষয়েও অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়েন তিনি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তাঁর নামে নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন ঘটনায় ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা।

পুলিশের দাবি, চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী ও রাউজান—এই পাঁচ থানা এলাকায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ত্রাসে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কারও মধ্যেই নিরাপত্তাবোধ নেই।

এই সন্ত্রাসী চক্রের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে সাজ্জাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল।

চাঁদা না পেয়ে দ্বিতীয় দফা হামলার আগে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে লেখা ছিল—“ওয়েট অ্যান্ড সি”।

এর কিছুদিন পরই গভীর রাতে বাড়িটি লক্ষ্য করে শুরু হয় গুলিবর্ষণ। গুলিতে জানালার কাচ ভেঙে যায়, দরজায় লাগে অসংখ্য বুলেটের চিহ্ন।

ঘটনার পর বাসাটিতে পুলিশ পাহারা বসানো হলেও তাতেও থামেনি হামলাকারীরা। পাহারার মধ্যেই আবারও সেখানে গুলি চালানো হয়।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, মুখোশ পরা চার সন্ত্রাসী ওই হামলায় অংশ নেয়। তাঁদের একজনের দুই হাতে ছিল দুটি পিস্তল।

অন্যদের হাতে ছিল সাবমেশিনগান (এসএমজি), চায়নিজ রাইফেল ও শটগান। ফুটেজে দেখা যায়, পরিকল্পিতভাবে বাড়িটি লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়ছে তারা।

এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অস্ত্রধারী রায়হান ও মোবারক এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে আতঙ্ক কাটছে না নগরবাসীর।

স্মার্ট গ্রুপ দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সিএমপি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে রাউজান থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় নতুন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি