ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: “বিবাদ নয়, সহায়তা-বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ: মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি”-বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক ও মানবতাবাদী সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের এই মহান আদর্শকে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বিবেকানন্দ স্টাডি সার্কেল’ এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও নবীনবরণ অনুষ্ঠান।
গত সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টায় জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনস্থ কিশোরীলাল রায় চৌধুরী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার অধ্যক্ষ ও সম্পাদক এবং বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ, বাংলাদেশের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান উপদেষ্টা শ্রীমৎ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজ।
বিবেকানন্দ স্টাডি সার্কেল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ দেবাশীষ পালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসী শ্রীমৎ স্বামী অম্বেশানন্দজী মহারাজ, জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক সঞ্জয় কুমার দে, সহকারী আবাসিক শিক্ষক ঝোটন চন্দ্র রায়, বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ, বাংলাদেশের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আশুতোষ রায় এবং সাধারণ সম্পাদক ড. সুকান্ত রায়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন কেবল ধর্মীয় সাধনা বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর চিন্তা মানবকল্যাণ, আত্মশক্তির জাগরণ, নৈতিক চরিত্রগঠন, অসাম্প্রদায়িকতা, সহিষ্ণুতা এবং সর্বধর্মসমন্বয়ের এক অনন্য জীবনদর্শন।
তাঁর বাণীতে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হিসেবে মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বের বিকাশ এবং মানবসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও চিন্তাধারার চর্চা একটি নৈতিক, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’-এই চেতনা মানবসেবাকে আধ্যাত্মিক সাধনার মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
তাঁর ‘সার্বজনীন ধর্ম’ ও ‘সমন্বয়ের’ দর্শন আজকের বিভাজন ও অসহিষ্ণুতায় পরিপূর্ণ বিশ্বে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও শান্তির পথ দেখাতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাঁর জীবন, দর্শন ও কর্মধারার অধ্যয়ন তরুণদের মধ্যে যুক্তিবোধ, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানের ধর্মীয় তাৎপর্য প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, ভারতীয় সনাতন ধর্মের উদার ও সর্বজনীন মর্মবাণীকে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন। তিনি ধর্মকে কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত ঐক্য ও সত্যকে উপলব্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্ম ও মত হলো একই পরম সত্যে পৌঁছানোর বিভিন্ন পথ। ফলে তাঁর আদর্শে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পরমতসহিষ্ণুতা এবং ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
‘বিবেকানন্দ স্টাডি সার্কেল’ এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন তাই স্বামী বিবেকানন্দের সার্বজনীন মানবধর্ম, আত্মজাগরণ, সেবা ও সমন্বয়ের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ।
নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে তাদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন চর্চার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান আয়োজকেরা।
অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো হয় এবং স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জ্ঞান, চরিত্র, সেবা ও মানবিকতার সমন্বয়ে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, বিবেকানন্দ স্টাডি সার্কেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তার চর্চা প্রসারে একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

