কর্ণফুলীর তীরে ১ বিলিয়ন ডলারের মহাযজ্ঞ

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ২১:১২

চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন স্বর্ণালী অধ্যায়। দীর্ঘ আট বছরের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চায়না ইকোনোমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর নির্মাণ কাজ।

বিগত ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণের পর নানা স্থবিরতায় বন্ধ থাকা এই বিশাল শিল্পাঞ্চলটি মূলত আলোর মুখ দেখেছে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর। তাঁর ঐকান্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সরাসরি মধ্যস্থতায় থমকে থাকা এই মেগা প্রকল্পটিতে গতি ফিরে আসে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাশে ৭৭৬ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই শিল্পাঞ্চল।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ চীনা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আশা করছে, আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে সিইআইজেডের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।

তবে এর আগেই, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু হতে পারে। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিইআইজেডের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: অর্থমন্ত্রী

আজ আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের নির্মাণ কাজের শুভ উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই বিনিয়োগের পথ ধরেই সৃষ্টি হবে বিশাল কর্মসংস্থান এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের রূপকল্প অর্জন সম্ভব হবে।

আমাদের সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে-বাংলাদেশ এখন ২৪/৭ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রাথমিকভাবে সিইআইজেড এ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়নসহ সার্বিক বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য খুব দ্রুত ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস’ চালু করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন অর্জিত মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে সহজে ফেরত নিতে পারেন, সেটির পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে দেশের পুঁজিবাজারকেও পুনর্গঠন করা হয়েছে।

বক্তব্যের শেষভাগে অর্থমন্ত্রী চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কৌশলগত খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামে একটি আধুনিক ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ গড়ে তোলার জন্য চীনের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান তিনি, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে কয়েকজন চীনা বিনিয়োগকারীর হাতে জমি সাব-লিজের অফিসিয়াল দলিল হস্তান্তর করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিনিয়োগকারীদের সার্বিক নিরাপত্তার সুদৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন।

তিনি জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই অর্থনৈতিক জোনের নিছিদ্র নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন করিডোর এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।

এছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (OSS)’-এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় পরিষেবার নিরবচ্ছিন্ন নিশ্চয়তা দেন তিনি।

প্রকল্পের কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাত্র ৭০০ মিটার দূরে কর্ণফুলী টানেল, ৬ কিলোমিটার দূরে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ১২ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম বন্দর। যা জাতীয় মহাসড়কের সাথে সরাসরি সংযুক্ত।

এই ত্রিমুখী সংযোগের কারণে সিইআইজেড থেকে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি শীর্ষ কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক মেলবন্ধন ঘটে।

অনুষ্ঠানে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনকিয়াং, চীনা রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান লি চেংগুই এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কয়েকজন চীনা বিনিয়োগকারী এবং চেম্বার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি