পটে পরিবর্তন এসেছে, বদলেছে সরকার। কিন্তু কর্ণফুলী নদীর বাকলিয়া তীরের সমীকরণ এক চুলও পাল্টায়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন ভূমিমন্ত্রীর ছত্রচ্ছায়ায় নদী তীরবর্তী সাড়ে পাঁচ একরেরও বেশি জমিতে গড়ে ওঠা দখলদারিত্বের থাবা এখন আরও বিস্তৃত।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় তোয়াক্কা না করে সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে তোষকের নিচে চাপা দেওয়া হয়েছে।
নদীর ইজারা আর বালুমহালের আড়ালে সেখানে রাতের আঁধারে জমজমাট হয়ে উঠেছে বিষাক্ত মাদকের কারবার। আর এই পুরো সাম্রাজ্য চালনার নেপথ্যে রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা মহিউদ্দিন বকুল ও সিকান্দার হোসেন রানা সিন্ডিকেট।
আরও পড়ুন
নথি বলছে, ১৯৩৪ সালে মৃত্যুবরণ করা চট্টগ্রাম নগরীর প্রখ্যাত দানবীর ও বনেদি ব্যবসায়ী হাজী চাঁদ মিয়া সওদাগরের ক্রয়কৃত বাকুলিয়া মৌজার ৫.৮২ একর সম্পত্তি ১৯৯২ সালের বিএস জরিপে ভুলবশত খাস খতিয়ানে উঠে যায়।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সওদাগরের আড়াই শতাধিক ওয়ারিশের পক্ষে চূড়ান্ত রায় দেন। কিন্তু রায়ের প্রয়োগ ঘটায়নি স্থানীয় প্রশাসন।
আইনি বাধায় কোণঠাসা হয়ে দখল টিকিয়ে রাখতে সিন্ডিকেটটি মাঠে নামায় এক অভিনব কৌশল।
সওদাগরের নাম ভাঙিয়ে এক ভুয়া ব্যক্তিকে খাড়া করা হয়, যাকে ‘স্বয়ং চাঁদ মিয়া সওদাগর’ হিসেবে জাহির করে পুলিশি সহায়তায় প্রকৃত ওয়ারিশদের ধাওয়া করা হচ্ছে।
সওদাগরের নাতি মোহাম্মদ মহসিন আক্ষেপ করে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায় হাতে পাওয়ার পরও আমরা নিজেদের ভিটেয় ঢুকতে পারছি না। বহু বছর আগে মারা যাওয়া দাদাকে ‘জীবন্ত’ বানিয়ে এখন পুলিশ দিয়ে উল্টো আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে।”
ইজারার শর্ত অনুযায়ী উজান থেকে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও বকুল-রানা চক্র সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে ‘শাহ আমানত সেতু’র ঠিক নিচের অংশ।
ড্রেজার দিয়ে অনবরত বালু ও মাটি তোলায় পিলারের তলদেশ ফাঁকা হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সংযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
শুধু পরিবেশ ও অবকাঠামো ধ্বংসই নয়, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। দিনে বালু ব্যবসার মহড়া চললেও গভীর রাতে শাহ আমানত সেতুর নিচ দিয়ে নদীপথে প্রবেশ করছে বড় বড় মাদকের চালান।
অসাধু চক্রটির সঙ্গে স্থানীয় পুলিশের সখ্যতার কারণে বাকুলিয়া থানার নাকের ডগায় মাদকের এই বিষাক্ত কারবার নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
তাছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী পরিচয় আড়াল করতে চক্রটি এখন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে আতঙ্কের রাজত্ব বজায় রাখছে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
অভিযোগের তীর থেকে বাঁচতে মহিউদ্দিন বকুল দাবি করেন, তারা বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এবং অবসরপ্রাপ্ত এক সামরিক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া সিকান্দার হোসেন রানার একটি ফোনালাপ চক্রটির মূল জালিয়াতি উন্মোচন করে দিয়েছে। সূত্র সিপি
ফাঁস হওয়া ফোনালাপে রানা বলেন, আমরা হচ্ছি ভাড়াটিয়া। ইকবাল সাহেব জায়গা দিক, যদিওবা উনি দেয় নাই। এগুলো আমি দখল করে নিছি। এখন ইকবাল সাহেব আমাকে জায়গা দিক।
নিজের মুখে জবরদখলের কথা স্বীকার করার পরও এই বেপরোয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ। উল্টো তারা বিষয়টিকে ওয়ারিশদের ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধ’ আখ্যা দিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সেতুকে ধসের মুখে ঠেলে দেওয়া, সুপ্রিম কোর্টের রায় অমান্য করা এবং বালুমহালকে মাদকের আস্তানা বানানোর এই বহুমুখী অপরাধের মূলোৎপাটন এখন সময়ের দাবি।
শুধু হাতবদল কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তনের তোয়াক্কা না করে এই বিষাক্ত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন ও উচ্ছেদ অভিযান না চালালে শাহ আমানত সেতুর ভাগ্য যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তেমনই বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাতুল্য আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

