বন্ধুত্বের আড়ালে নির্মম পরিণতি: মাদক, জুয়া ও কিশোর অপরাধের বলি অপ্রতিম

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি হুঙ্কার-১২ ঘণ্টার মধ্যে ৪ ঘাতক গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:১৪

একটি মিষ্টি হাসির কিশোর মুখ, বুকে একরাশ স্বপ্ন, আর হাতে মায়ের ভালোবাসায় দেওয়া এক মুঠোফোন-এই ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের পুরো পৃথিবী।

কোটবাড়ি বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এই মেধাবী শিক্ষার্থী হয়তো ভেবেছিল, যাদের সাথে লালমাই পাহাড়ে যাচ্ছে, তারা তার বন্ধু।

কিন্তু সে জানত না, ওই আপাত বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল হিংস্র পশুবৃত্তির লালসা, মাদক আর জুয়ার অন্ধকার থাবা। ‘ছবি তুলব’-বন্ধুদের এই একটিমাত্র প্রলোভনই অপ্রতিমের জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হলো।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে থমকে গেছে পুরো দেশ।

যে বয়সে হাতে বই-খাতা আর খেলার সামগ্রী থাকার কথা, সেই বয়সে সহপাঠী ও জ্যেষ্ঠ সঙ্গীদের হাতে এভাবে অপ্রতিমের প্রাণ ঝরে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের কান্না নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পচনের এক বীভৎস দলিল।

গত শুক্রবার দুপুরে মায়ের আইফোনটি হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। স্বজনরা ভেবেছিলেন, বন্ধুদের সাথে একটু আনন্দ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে বাড়ির আদরের একমাত্র ধন।

কিন্তু সময় গড়িয়ে রাত হলেও অপ্রতিম আর ফেরেনি। স্বজনদের আকুল আকুতি, কান্নাকাটি আর কোটবাড়ির অলিগলিতে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির প্রায় ২২ ঘণ্টা পর আসে সেই স্তব্ধ করে দেওয়া খবর।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের নির্জন লালমাই পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে পড়ে রয়েছে অপ্রতিমের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ।

মায়ের আদরের সেই নিষ্পাপ অপ্রতিম তখন কেবলই একটি নিচ্ছদ্র লাশ। একটি আইফোনের লোভ আর নেশার টাকা জোগাড়ের নির্মম মানসিকতা কীভাবে এত অল্প বয়সী কিছু কিশোর-যুবককে নরপশুতে রূপান্তর করতে পারে, লালমাই পাহাড়ের সেই রক্তের দাগ যেন সমাজকে সেই প্রশ্নই ছুরে দিচ্ছে।

ঘটনার ভয়াবহতায় স্তম্ভিত দেশবাসীকে স্বস্তি দিয়ে দ্রুততম সময়ে অ্যাকশনে নেমেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অপরাধীদের কোনো সুযোগ না দিয়ে ঘটনার মাত্র ১২ ঘণ্টার ভেতর চিরুনি অভিযান চালিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার ঘাতককে। অপ্রতিমের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া সেই আইফোনটি এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর আলামত উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে উন্মোচিত হয় এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক চিত্র। যারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর, তারা বয়সে অপ্রতিমের চেয়ে মাত্র ৫ থেকে ১০ বছর বড়। মেলামেশা ও ওঠাবসার সুবাদে অর্জিত ‘বিশ্বাস’কেই তারা ব্যবহার করেছিল অপ্রতিমকে পাহাড়ি জঙ্গলে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফাঁদ হিসেবে।

আজ রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, কুমিল্লার এ ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। পুরো দেশের মানুষ এতে গভীরভাবে মর্মাহত।

তবে ঘটনার ভয়াবহতার বিপরীতে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাশ উদ্ধার এবং তার পরবর্তী ১২ ঘণ্টার ভেতর মূল চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে তারা অপরাধ স্বীকার করাতে সক্ষম হয়েছে।

অপরাধের মূল শিকড় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্ত্রী একটি গভীর সামাজিক সত্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, আমাদের সমাজে কিশোর অপরাধের যে চক্র গড়ে উঠেছে, তার পেছনে বড় কারণ হলো মাদক ও জুয়ার ভয়াবহ বিস্তার।

এই ঘাতকরা অপ্রতিমের পূর্বপরিচিত হলেও তারা মাদক ও জুয়ার ফাঁদে পড়ে এতটা অমানবিক হয়ে উঠেছিল। সমাজে পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর আগেই শুরু হয়েছে, যার নির্মম খেসারত দিতে হলো এই নিষ্পাপ শিশুটিকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করেন যে, পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় যেভাবে দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও অতি দ্রুত জমা দেওয়ার বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, কেবল পুলিশ বা আইন দিয়ে এমন সামাজিক ব্যাধি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, কিশোরদের সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই খেলাধুলা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জোরালো নজর দিতে হবে। সেই সাথে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ ফেরাতে পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে সহপাঠী ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে কুমিল্লা কোটবাড়ির বাতাস। মা নাহিদা বেগম আর বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারের এই শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।

তবে দেশবাসীর এখন একটাই দাবি-পুলিশের এই প্রশংসনীয় দ্রুততার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ সম্পন্ন হোক, এবং অপ্রতিমের ঘাতকদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক যেন আর কোনো মায়ের বুক বন্ধুত্বের আড়ালে থাকা এমন নরপশুদের হাতে খালি না হয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি