জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (শিপ রিসাইক্লিং) খাতকে বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী শিল্পে রূপান্তর এবং এতে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।
আর এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুদৃঢ় কর্মপরিবেশ।
এই দুই শর্ত পূরণ করা গেলেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিলাসবহুল ও বিশালাকার জাহাজগুলোর গন্তব্য হবে বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলো।
আরও পড়ুন
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের এক অভিজাত হোটেলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আয়োজিত ‘নিরাপত্তা সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব আশাবাদ ব্যক্ত করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রাশেদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে জাইকা (JICA), শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি)।
ইউরোপের বাজার ধরা ও ‘জিরো ডেথ’ লক্ষ্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত সচিব রাশেদুল ইসলাম বলেন, সরকার চায় জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার অর্জনের পথ উন্মোচন করতে। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি, যা নিয়ে জাইকার সহযোগিতায় আমরা দিনরাত কাজ করছি।
এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা ইউরোপীয় জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের কাজ পাব, যা পরিবেশগত কারণে বর্তমানে পাচ্ছি না।
বাংলাদেশ অতীতে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বে এক নম্বর স্থানে ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমরা আবারও সেই শীর্ষ অবস্থানে ফিরতে চাই। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে এবং সুপারিশগুলো গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আমাদের মূল লক্ষ্য হলো-এই শিল্পে মৃত্যুর হার একবারে শূন্যে (‘জিরো ডেথ’) নামিয়ে আনা। এই সম্ভাবনাকে আমরা কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেব না।
নিরাপত্তায় কোনো শর্টকাট নেই
অনুষ্ঠানে জাইকা বিশেষজ্ঞ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ উপদেষ্টা আকিরা ওকামোটো কারিগরি ও সচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরে বলেন, ডিএসআর (DSR) সার্টিফিকেট অর্জন করলেই দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। নিরাপত্তার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই।
দুর্ঘটনা রুখতে হলে শক্তিশালী ‘সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ এবং প্রতিটি ইয়ার্ড ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকের আন্তরিক প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য।
তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়, বরং অতীত দুর্ঘটনা ও কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপদ প্রোটোকল তৈরি করা।
ভাগ্যবাদ নয়, দরকার নিরাপদ কর্মপরিবেশ
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নিয়তিবাদের ওপর নির্ভর না করার তাগিদ দিয়ে বলেন, ইয়ার্ডগুলোকে দ্রুত ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তর করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দিকে সরকার সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে।
সম্প্রতি দুর্ঘটনায় নিহত কর্মীদের প্রতিটির পরিবারকে ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার সচ্ছ তদন্ত শেষে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
গবেষণা ও সুপারিশ
অনুষ্ঠানে বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইয়াসির আরাফাত খান গত ১৪ আগস্ট ইয়ার্ডে ঘটা দুর্ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও তদন্তের ফলাফল তুলে ধরেন।
পাশাপাশি, আবদ্ধ স্থানে (Confined Space) সুরক্ষার নিরাপত্তা প্রোটোকল বিশদভাবে উপস্থাপন করেন জাইকা বিশেষজ্ঞ আকিরা ওকামোটো।
নিরাপত্তা সংস্কৃতি জোরদারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বিএসআরবি মহাপরিচালক গাজী মো. আসাদুজ্জামান কবির।
জাইকার প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকৌশলী সৌমিক শরীফ দীপ্ত জানান, গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং নিশ্চিতে হংকং কনভেনশন, বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং রুলস ও লেবার রুলস অনুসরণের পাশাপাশি ইয়ার্ড মালিকদের কারিগরি, আর্থিক ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাইকার সার্বিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মোহসিন এবং চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জুনাইত কাওসারসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিখুঁত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ আবারও বৈশ্বিক শিপ রিসাইক্লিং বাজারে শীর্ষস্থান দখল করবে-এমন দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


