যে চিকিৎসালয়ে মানুষ সেবা ও সুচিকিৎসার আশায় আসে, সেই চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এখন এক কর্মীর কারণে আতঙ্কের নাম।
হাসপাতালের ভেতরে নারী সহকর্মীকে অবরুদ্ধ রেখে মানসিক নির্যাতন, গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণ, অনৈতিক প্রস্তাব এবং শেষ পর্যন্ত এক লাখ টাকায় বিষয়টি সুরাহা করার প্রস্তাব-সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ ও কলঙ্কজনক অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে।
এই তাণ্ডবের মূল কারিগর হাসপাতালের ক্লিনিং সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, হাসপাতালের সর্বোচ্চ কার্যনির্বাহী কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেও অজ্ঞাত এক অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে সেই নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়নি। বরঞ্চ বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অভিযুক্ত।
সংবাদপত্রের হাতে আসা নথি ও ভুক্তভোগী ইসিজি সহকারী টেকনিশিয়ান এক নারীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায় সাইফুলের এই নিপীড়নের বিস্তারিত চিত্র।
গত ২৭ আগস্ট হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া সেই আবেদনে ওই নারী উল্লেখ করেছেন, কর্মস্থলে তিনি প্রতিনিয়ত সাইফুলের শিকার হচ্ছিলেন।
ইসিজি কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া, সহকারী টেকনিশিয়ানের দায়িত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি এবং গায়ের সাদা অ্যাপ্রোন খুলে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত তাকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করতেন সাইফুল।
কেবল কর্মক্ষেত্রেই ক্ষান্ত হননি তিনি, ওই সহকর্মীর বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার চাপ সৃষ্টি করা এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হতেই সাইফুলের আগ্রাসন রূপ নেয় সরাসরি তাড়া করে বেড়ানোর ব্যাধিতে। ভুক্তভোগীর বাসার সামনে গিয়ে পিছু নেওয়া এবং প্রতিনিয়ত নজরদারির কারণে তীব্র নিরাপত্তা হীনতায় দিন কাটাচ্ছেন এই নারী কর্মী।
কর্মক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা বলতে কিছু রাখেননি এই কর্মী। দায়িত্ব পালনের সময় ইসিজি কক্ষে ঢুকে মোবাইল ফোনে গোপনে তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন সাইফুল।
ভিকটিম কাজের প্রয়োজনে কক্ষের বাইরে গেলেই সেখানে হাজির হয়ে সহকর্মীদের কাছে তার অবস্থান জানতে চেয়ে জেরা করতেন। এমনকি রোগীদের উপস্থিতিতেও ওই নারীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে রোগীদের উসকে দেওয়ার মত ভয়ংকর কাজও করেছেন সাইফুল।
এমনই এক উসকানিতে উত্তেজিত এক রোগী ওই নারীকে মারতে পর্যন্ত তেড়ে আসেন, যা পরবর্তীতে হাসপাতালের পরিচালকের নির্দেশে একজন সুপারভাইজার এসে পরিস্থিতি সামাল দেন।
এই চক্রান্তের মধ্যে উঠে এসেছে এক লাখ টাকার রফা ও হুমকির প্রসঙ্গ। সাইফুলের অশুভ আচরণের কারণ জানতে গিয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ফারুকের মুখোমুখি হন ওই নারী।
ফারুক তাকে সাফ জানিয়ে দেন-সাইফুলকে এক লাখ টাকা দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই টাকার প্রস্তাব ও অনৈতিক দাবির বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতেই ঘটে আরেক বিপত্তি। গত ২৪ আগস্ট নিরাপত্তাকর্মী ফারুক সরাসরি হুমকি দেন ওই নারীকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাইফুলের এই বেপরোয়া আচরণের শেকড় অনেক গভীরে।
হাসপাতালের নথি বলছে, ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট হাসপাতালের ভেতরেই অন্য একটি অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ায় এবং সিসিটিভি ফুটেজে তার সত্যতা মেলায় সাইফুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
তবে সেই যাত্রায় অদৃশ্য দলীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক খুঁটির জোরে তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে চাকরিতে বহাল হন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, কার্যনির্বাহী কমিটির এক সদস্য, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের প্রভাবশালী এক শীর্ষ নেতা এবং হাসপাতালের এক পরিচালকের প্রচ্ছায়াকে ঢাল বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নারী কর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও নৈরাজ্য চালিয়ে আসছেন সাইফুল।
সাম্প্রতিক অভিযোগের পর গত বৃহস্পতিবার কার্যনির্বাহী কমিটি সাইফুলকে বরখাস্ত করতে নির্দেশ দিলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
কেন প্রশাসনিক প্রধান তথা পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নুরুল হক এই সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখেছেন, তার কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি।
একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন ধরেননি। কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ ঢাকায় অবস্থান করায় বিস্তারিত না জানানোর অজুহাত দিলেও বরখাস্তের নির্দেশের কথা স্বীকার করেছেন। সূত্র-ঢাকা পোস্ট।
এদিকে, ক্লিনিং সুপারভাইজার সাইফুল গণমাধ্যমকে বিষয়টিকে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও ভুক্তভোগী নারী এখন নিজের জীবনের নিরাপত্তায় শঙ্কিত।
তিনি ইসিজি কক্ষ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে পুরোনো ঘটনার মতো এবারও রাজনৈতিক প্রভাবে প্রমাণের তথ্য মুছে ফেলা না হয়।
একটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসালয়ে এমন ভয়াল ও নিরাপদতাহীন পরিবেশ বজায় থাকা এবং অপরাধীকে বারবার রাজনৈতিক ছায়াতলে সুরক্ষা দেওয়া কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাই নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।
নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি না করলে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ও নারী কর্মীদের নিরাপত্তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

