চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় গত জুনে সংঘটিত আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী (মাসুদ) হত্যার সিসিটিভি ফুটেজে এক অস্ত্রধারীর অবয়ব ফুটে উঠেছিল।
হাতে ৯ এমএম পিস্তল, চোখে ঠাণ্ডা মাথার নিষ্ঠুরতা। সেই খুনি কালা মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা’ মোবারক অবশেষে ধরা পড়েছে।
ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর পল্লানপাড়ার একটি নির্জন বাড়িতে ২৬ আগস্ট ভোররাতে পুলিশি অভিযানে মোবারক ছাড়াও ৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সাথে পুলিশ বের করে এনেছে চট্টগ্রামজুড়ে বিস্তৃত এক ভয়াবহ অপরাধ সাম্রাজ্য ও সরকারি অস্ত্র লুটের আতঙ্কজনক চিত্র।
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএম-এর নির্দেশে এবং হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ফটিকছড়ি থানা-পুলিশ যখন ওয়াজ পল্লানের বাড়ি ঘেরাও করে, তখন রাতের নীরবতা চিরে ভেসে আসে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই মোবারক ও তার সহযোগীরা সরাসরি গুলি ছুড়তে শুরু করে। সরকারি অস্ত্র রক্ষা ও আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।
গোলাগুলির তীব্রতায় গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে পুলিশ ঘেরাও ভাঙেনি, আস্তানা থেকেই গ্রেফতার করা হয় চার দুর্ধর্ষ অপরাধীকে।
অভিযানে উদ্ধার করা অস্ত্রের তালিকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলার মতো। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে:
১টি ৯ এমএম বিদেশি তরাস পিস্তল (মেড ইন ব্রাজিল): প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পায়, ব্রাজিলের তৈরি এই ঘাতক পিস্তলটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া একটি সরকারি অস্ত্র।
১টি ৭.৬৫ এমএম বিদেশি পিস্তল (ইতালির তৈরি), ১টি বিদেশি রিভলবার (পাকিস্তানের তৈরি), ১টি দেশীয় তৈরি পিস্তল, ১৮ রাউন্ড ۹ এমএম ও ৫ রাউন্ড ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের গুলি, ৩টি খালি ম্যাগাজিন, ৩টি পিস্তলের গুলির খোসা ও ৪টি শটগানের গুলির খোসা।
থানা থেকে লুট হওয়া সরকারি পিস্তল কীভাবে একজন চিহ্নিত কিলার ও চাঁদাবাজের কাছে পৌঁছাল, সেই প্রশ্ন এখন কেবল চট্টগ্রাম পুলিশকে নয়, পুরো প্রশাসনিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।
কে এই ‘গলাকাটা’ মোবারক?
মানিকপুরের লোকমান হোসেনের ছেলে ৩৭ বছর বয়সী মুহাম্মদ মোবারক হোসেন কেবল একজন ব্যক্তি নয়, উত্তর চট্টগ্রাম ও নগরের অপরাধ জগতের এক নামকরা আতঙ্কের প্রতীক।
বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার ডেভিড ইমন ও রায়হানের সরাসরি প্রধান ‘শুটার’ হিসেবে কাজ করত এই মোবারক।
অস্ত্র পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত এই ক্যাডার শুধু ফটিকছড়ির জামাল ও সাদ্দাম হত্যা, রাউজানের মাসুদ হত্যা কিংবা নগরের সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলাতেই জড়িত নয়, বড় সাজ্জাদের নির্দেশে সংঘটিত প্রায় প্রতিটি টার্গেটেড কিলিং ও ভয়াল চাঁদাবাজিতে সে নিজে উপস্থিত থেকে ট্রিগার চাপত।
বড় সাজ্জাদের আদেশের বাইরেও নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফটিকছড়ি ও আশপাশের এলাকায় এক সমান্তরাল ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছিল এই মোবারক।
কালা মোবারকের সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার বিশ্বস্ত তিন সহযোগীকে, যাদের আস্তানাকে মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মোহাম্মদ রাইহান ওরফে রায়হান (৪০) বাড়ি লেলাংয়ের শাহনগর দিঘির পাড়ে (ওয়াজ পল্লানের বাড়ি)। সে আলোচিত শিবির বাবুলের ফুফাতো ভাই হিসেবে পরিচিত।
মোঃ ফরিদ (৫০) পিতা মৃত আমির হোসেন, একই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ও মোঃ নাছির (৫২) পিতা মৃত শমসু সওদাগর, ওয়াজ পল্লানের বাড়ির অন্যতম বাসিন্দা।
এই আস্তানা থেকেই পরিচালিত হতো পাহাড়তলী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
তদন্তের মুখে নতুন মোড়
পাহাড়তলীর মাসুদ হত্যাকাণ্ডে এর আগে সরাসরি জড়িত আসামি আফসার, ধামা ইলিয়াস ও দিদার গ্রেফতার হলেও মোবারকের এ গ্রেফতার ও লুট হওয়া অস্ত্রের উদ্ধার পুরো ঘটনার গতিপথ বদলে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, অপরাধী যতই শক্তিশালী কিংবা দুর্ধর্ষ হোক না কেন, তাদের সমূলে উৎখাত না করা পর্যন্ত এ অভিযান থামবে না।
তবে একটি লুট হওয়া সরকারি তরাস পিস্তল কীভাবে দুর্ধর্ষ সাজ্জাদ বাহিনীর হাত ঘুরে খুনি মোবারকের ট্রিগারে পৌঁছাল-সেই অন্ধকার নেপথ্য উদ্ঘাটনে এখন থেকে গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

