চট্টগ্রামের সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ-নামটি শুনলেই আজকাল আতঙ্কের শিহরণ জাগে অনেকের মনে। ৩৫ বছর বয়সী মো. রায়হান।
প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার না হওয়া, এক সময়ের সাধারণ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রায়হানের আজকের পরিচয় পুলিশের তালিকাভুক্ত এক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’।
পুলিশি ভাষায়, ছদ্মবেশে চোলাই মদ বিক্রির মাধ্যমে যার অন্ধকার জগতে পথচলা শুরু, আজ সে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম নিয়ন্ত্রক।
রায়হানের এই আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কারাগারের দিনগুলো। একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাবাসের সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের। সেই থেকে শুরু।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে বের হয়ে রায়হান যেন একেবারেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাতেও কথা না বলে সোজা গুলি চালানো শুরু করেন তিনি।
বিদেশে পলাতক ‘বড় সাজ্জাদ’ এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা ‘ছোট সাজ্জাদে’র সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অন্যতম স্তম্ভ এখন এই রায়হান।
এমনকি ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর তার বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের দেখভালের মূল দায়িত্বও এই সাবেক অটোরিকশাচালকের ওপর অর্পিত হয়েছে।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে এক দুঃসাহসিক অভিযানে পুলিশ যখন রায়হানকে প্রায় ঘেরাও করে ফেলেছিল, ঠিক তখনই ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি।
যদিও তার সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল পুলিশ।
অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম মন্তব্য করেছিলেন, রায়হান কোনোভাবে পালিয়ে গেছে, তবে সে জাহান্নাম না দেখলেও দোজখ দেখে ফেলেছে।
কিন্তু সেই ‘দোজখ’ দেখা রায়হান নীরব থাকেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পলাতক জীবনযাপন করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
ফেসবুকে তাঁর দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মূল সুর-‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ (অপেক্ষা করুন এবং দেখুন)।
পুলিশ প্রধানের মন্তব্যকে সরাসরি কটাক্ষ করে তিনি পাল্টা লিখেছেন, দোজখ আর জাহান্নামে তফাত কী মাসুদ স্যার? ধন্যবাদ নোয়াখালীর মানুষদের, তারা এমন নিকটভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।
ফেসবুকের সেই পেস্টে রায়হান দাবি করেন, তাঁর দলের অনেক লোক জেলে থাকায় তিনি আপাতত একা হয়ে পড়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মতো শত শত ‘রায়হান’ প্রস্তুত রয়েছে।
নতুন সহযোগীরা পুরোনোদের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠবে বলেও তিনি পোস্টটিতে হুঁশিয়ারি দেন।
তবে এ নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে জানান, পলাতক সন্ত্রাসী অনেক কথাই বলতে পারে। রায়হানের পোস্টে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। সূত্র-প্রথম আলো
এককালের দরিদ্র অটোরিকশাচালক থেকে আজকের ভয়াল সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার পেছনে কেবল অপরাধ নয়, সামাজিক ও অপরাধজগতের এক গভীর অন্ধকার গলি কাজ করেছে।
রায়হানের মতো যুবকদের এই বিপথগামী পথ রোধ করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

