সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সেই দুর্ঘটনাকবলিত স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাসের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে গেলেন আরও এক শ্রমিক।
নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা ইদ্রিস আলী (৫০) বুধবার সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
এ নিয়ে অভিশপ্ত ওই জাহাজ কাটতে গিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
আরও পড়ুন
উপার্জনের তাগিদে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা জামালপুরের সন্তান ইদ্রিস ফেরেননি স্বজনদের কাছে। বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাঙ্কে নেমেছিলেন, অথচ বাড়ি ফিরল তাঁর প্রাণহীন নিথর দেহ।
বাতাসে নেই, কিন্তু তলানিতে ওত পেতে আছে বিষ
দুর্ঘটনার পর চার দিন কেটে গেছে। কিন্তু আতঙ্ক কমেনি, বরং রহস্য ও বিপদের গভীরতা ঘনীভূত হচ্ছে।
তদন্ত দল ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সাম্প্রতিক যৌথ পরিদর্শনে ধরা পড়েছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাহাজের আটটি ব্যালাস্ট ট্যাঙ্কের মধ্যে তিনটি ট্যাঙ্কে এখনও জমে আছে ঘন কালো স্লাজ বা তলানি।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর সমীকরণ-
খোলা বাতাসের চিত্র: জাহাজের বাইরে বাতাসে বর্তমানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি শূন্য পিপিএম এবং অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক (২০.৯%)।
ট্যাঙ্কের ভেতরের গোপন ঘাতক: স্থির পানির নিচে ঘন স্লাজের সঙ্গে মিশে আছে হাইড্রোজেন সালফাইড। নমুনা সংগ্রহের জন্য পানি নাড়াচাড়া করতেই ভেতরে ভেসে ওঠে ৮ থেকে ১৮ পিপিএম বিষাক্ত গ্যাস।
আশঙ্কা: বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, পানি স্থির থাকায় গ্যাস আপাতত আটকে আছে। কিন্তু স্লাজ বা পানি অপসারণের কাজ শুরু হলেই এই ঘাতক বিষ ফের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।
তদন্ত ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, চার দিনে জোয়ারের পানি বা বাতাসে গ্যাস কিছুটা দ্রবীভূত হলেও অক্ষত লিঙ্কযুক্ত ট্যাঙ্কগুলো কতটা ঝুঁকিমুক্ত, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ল্যাবে সংগৃহীত স্লাজ ও পানির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
রিপোর্ট আসার পর ‘প্রান্তিক মেরিন’ নামের একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কীভাবে ট্যাঙ্কের পানি ও স্লাজ নিরাপদ উপায়ে অপসারণ করা যায়।
৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজ ‘এমটি রাসি’র ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক কাটতে গিয়ে নিমেষেই শেষ হয়ে গেছে ৯টি তাজা প্রাণ, আহত হয়েছিলেন আরও ৬ জন। সবশেষ ইদ্রিস আলীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই মৃত্যুর তালিকা আরও দীর্ঘ হলো।
সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে অনিরাপদ কাজের পরিবেশে শ্রমিকের রক্তের এই দাগ কি শুধুই এক ল্যাব রিপোর্টের অপেক্ষায় থমকে থাকবে, নাকি সুরক্ষিত হবে শ্রমিকের জীবনের গ্যারান্টি-সেই প্রশ্নই এখন বাতাসে ভাসছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

