রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে ক্ষমতার চেহারা বদলেছে, কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোর প্রশাসনিক রন্ধ্রে গেঁড়ে বসা দুর্নীতির পুরোনো সিন্ডিকেট রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে।
চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগে সম্প্রতি উন্মোচিত হয়েছে এমনই এক রাজনৈতিক ছদ্মবেশ ও অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর নেপথ্য গল্প।
ক্ষমতার মসনদ বদলাতেই রাতারাতি রাজনৈতিক আদর্শের চামড়া বদলে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ঢাকা দেওয়ার এক চক্রান্ত এখন চট্টগ্রামজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
এই পুরো চক্রান্তের মূল কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম গণপূর্তের প্রকৌশলী মেহেদীর নাম।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ছাত্রলীগের সাবেক এই ক্যাডার এবং গোপালগঞ্জের অধিবাসী প্রকৌশলী এতদিন ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা বাগিয়েছেন।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নিজের প্রশাসনিক অবস্থান বাঁচাতে তিনি রাতারাতি ‘সাবেক বিএনপি নেতা’ সেজে নতুন পরিচয় গড়ে তোলেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই রাজনৈতিক পরিচয়ের ছদ্মবেশ ব্যবহার করে এবং মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন বাগিয়ে নেন।
মেহেদীর এই রাজনৈতিক বহুরূপী রূপ ধারণের মূল উদ্দেশ্য কেবল নিজের পদরক্ষা নয়, বরং বিগত এক যুগে আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট ও বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স’ (এনডিই)-কে আইনি ও দাপ্তরিক জটিলতা থেকে উদ্ধার করা।
অভিযোগ উঠেছে, এনডিই-র বিগত দিনের অপকর্ম ও জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে এবং চট্টগ্রাম গণপূর্তে তাদের আটকে থাকা কাজের অনুকূলে ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে প্রকৌশলী মেহেদী ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন সম্পন্ন করেছেন।
যে প্রতিষ্ঠানটি এত দিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ক্ষমতাসীনদের অর্থ ও রসদ জোগানের অভিযোগে অভিযুক্ত, সেই বিতর্কিত এনডিই-কে এখন মন্ত্রণালয়ের দরবারে ‘বিএনপি ঘরানার প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সাফাই গাইছেন এই প্রকৌশলী। সূত্র-ডিএএম
অথচ এনডিই-র দুর্নীতি ও অনিয়মের তালিকা দীর্ঘ। বিগত এক যুগে আওয়ামী পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নাম ভাঙিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ভুয়া ও জাল নথিপত্র জমা দিয়ে কাজ বাগানো থেকে শুরু করে অত্যন্ত নিম্নমানের অবকাঠামো নির্মাণ-সবখানেই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের একক রাজত্ব।
কেবল অবকাঠামো খাতই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন থেকে পাথর ও রেডি-মিক্স আমদানির আড়ালে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে এদের বিরুদ্ধে।
সড়ক ও জনপথ, নৌপরিবহন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরে এনডিই গড়ে তুলেছিল জালিয়াতির একচ্ছত্র নেটওয়ার্ক।
সরকার বদল হলেও এই অপরাধী চক্রের কাঠামো যে কতটা অটুট, চট্টগ্রাম গণপূর্তে প্রকৌশলী মেহেদীর এই তৎপরতা তারই বড় প্রমাণ।
কেবল দলীয় ট্যাগ পরিবর্তন করে জনগণের রাজস্বের অর্থ লুটেপুটে খাওয়ার এই পাঁচতারা নাটক বন্ধ হওয়া জরুরি।
কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পদায়ন নিয়ে যারা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের তোষামোদি করে চলেছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে এখন সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

