ঝকঝকে আলো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং চটকদার প্যাকেটজাত খাবার। চট্টগ্রাম নগরীর নামীদামি এসব বিপণি ও খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আসলে বিক্রি হচ্ছিল অস্বাস্থ্যকর, পচা ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ উপাদান।
বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে নগরবাসীর নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা বিপজ্জনক সব অনিয়মের চিত্র।
চট্টগ্রাম মহানগরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে চার খাদ্য প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় অনাদায়ে দেওয়া হয়েছে কারাদণ্ড।
উৎসব সুপার শপ:
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালিত এই অভিযানে সবচেয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য মিলেছে ‘উৎসব সুপার শপ’-এ। ঝকঝকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের আড়ালে গ্রাহকদের হাতে দিনের পর দিন তুলে দেওয়া হচ্ছিল পচা মরিচ, নষ্ট মসলা, মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস এবং মেয়াদহীন চকলেট।
উৎসবের জালিয়াতি শুধু পচা খাদ্য বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আড়ালে চলেছে ভোক্তা ঠকানোর সুনির্দিষ্ট ছক।
আমদানিকৃত পণ্যের মূল পুষ্টিতথ্য ঢেকে দিয়ে নিজস্ব স্টিকার বসানো, নিবন্ধনের তথ্য গায়েব করা, নিবন্ধনবিহীন শিশুখাদ্য ও অনুমতিহীন ফুড সেপ্লিমেন্ট বিক্রির মাধ্যমে তারা জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে চরম ঝুঁকিতে।
এমনকি একই অননুমোদিত সরঞ্জামে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমতি ছাড়া ঘরোয়া আচার ও পণ্য বিক্রির জঘন্য সত্যও বেরিয়ে এসেছে এই একটি শোরুম থেকেই।
অনিয়মের এই মহোৎসবে উৎসব সুপার শপকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারি :
অভিজাত মিষ্টি ও বেকারি পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারি’র কারখানায় গিয়ে দেখা মেলে আরও বীভৎস চিত্র। কারখানায় পাওয়া অনিয়মের তালিকাটিও দীর্ঘ।
ঘি-এর নামে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, পচা-বাসি মিষ্টির উচ্ছিষ্ট পুনরায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, পোকাযুক্ত বাদাম ও নোংরা কম্বল দিয়ে দই জাক দেওয়ার মতো অকল্পনীয় উপায়ে তৈরি হচ্ছিল মিষ্টি।
কারখানার নোংরা ড্রেনেজ, ভাঙা টাইলস এবং চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ পাওয়ায় ফ্লেভারসকে সবচেয়ে বেশি-১৯ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নিম্নমানের ঘি ব্যবহার করে বেকারি পণ্য উৎপাদন, পচা-বাসি মিষ্টির উচ্ছিষ্ট সংরক্ষণ ও ব্যবহার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি, কেক ও বিস্কুট সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
খাদ্যপণ্যের যথাযথ লেভেলিং না থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদনের পাশাপাশি ভাঙা টাইলস ও নোংরা ড্রেনেজের বিষয়ও উঠে এসেছে।
মেরিডিয়ানে পোকামাকড় ও পোড়া তেলের অভিযোগ:
মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডে বিভিন্ন চিপস, নুডলস ও ম্যাংগো বারের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ পাওয়া যায়। আদালত সূত্রে আরও জানা গেছে, উৎপাদন এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি তেলাপোকার বিচরণও দেখা গেছে।
ম্যাংগো পাল্প সংরক্ষণের ড্রামে পোকামাকড়ের উপস্থিতি, ভাঙা ও তৈলাক্ত মেঝে এবং পোড়া তেল ব্যবহারের মতো বিষয়ও অভিযানে ধরা পড়ে।
এই প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রিও ক্যাফেতেও ছাড় নেই:
রিও ক্যাফে-মাজায়দারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রি, পচা-বাসি খাবার সংরক্ষণ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আদালত সূত্র।
প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও সনদ ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছিল বলেও অভিযানে উঠে এসেছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ১০ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মেট্রোপলিটন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম জানান, অভিযানে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, খাদ্য ব্যবসায়ীদের মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে মানোন্নয়নের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তবে আদালতের পদক্ষেপ এখানেই শেষ হচ্ছে না। ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারিকে ২২ সেপ্টেম্বর, মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টসকে ৬ সেপ্টেম্বর এবং উৎসব সুপার শপকে ৩০ আগস্ট আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে চার প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকার জরিমানা তাৎক্ষণিক শাস্তির হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরবর্তী নজরদারি ও আদালতে জবাবদিহির প্রক্রিয়াও।
অভিযানে উঠে আসা অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মোকাবিলা করে, নির্ধারিত সময়ে কী প্রতিবেদন দেয় এবং পরবর্তী পরিদর্শনে তাদের খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আসে কি না-এখন নজর থাকবে সেদিকেই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

