চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক অপরাধ সিন্ডিকেটের উপস্থিতি উন্মোচিত হয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে।
পেশাদার কোনো অপরাধীচক্র নয়, বরং এক ডিজিটাল প্রতারক এবং সিএমপিরই দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) আঁতাত দীর্ঘ দেড় বছর ধরে পুরো বন্দরনগরীর শান্তিশৃঙ্খলা ও আইনি ব্যবস্থাপনাকে জিম্মি করে রেখেছিল।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুবায়েরুল হক জিয়ান নামের এক বহুমুখী প্রতারক ডিজিটাল অ্যাপের সাহায্যে নিজের কণ্ঠকে নারী কণ্ঠে রূপান্তর করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।
এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন সিএমপির সাবেক কমিশনার ও বর্তমান এপিবিএনের প্রধান (অতিরিক্ত আইজিপি) হাসিব আজিজ।
এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন সিএমপির দুই ওসি বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলাম।
জাহেদুল বর্তমানে পাঁচলাইশ থানায় এবং বাবুল আজাদ ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগে কর্মরত। তৎকালীন কমিশনার হাসিবের দায়িত্বকালে বাবুল পাহাড়তলী, ডবলমুরিং ও চকবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।
যেভাবে পাতা হয় প্রযুক্তিভিত্তিক জাল
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি বাবুল আজাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় প্রতারক জিয়ানের। এরপর বাবুলের মাধ্যমে তার ব্যাচমেট ও পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলামের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক অশুভ ট্রাইঅ্যাঙ্গেল। চক্রটি কৌশল হিসেবে চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সাইমার ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে।
ওসি বাবুল মডেল সাইমাকে নিজের শালিকা পরিচয়ে কমিশনারের সঙ্গে পরিচয় করান। ওই রাতেই ‘সানজিদা ইসলাম সাইমা’ নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে কমিশনারকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় জিয়ান।
প্রযুক্তিভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। লাইভ ভিডিওর ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে এআই প্রযুক্তি ও ডিজিটালি ম্যানিপুলেট করা ভিডিও কলের মাধ্যমে কমিশনারকে বিভ্রান্ত করা হয়। পরবর্তীতে চারটি অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে শুরু হয় নির্মম ব্ল্যাকমেইল।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সাবেক কমিশনার হাসিবের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত প্রতারকচক্রের তিনটি মোবাইল নম্বর এবং চারটি ভিডিওর সন্ধান মিলেছে।
এর মধ্যে তিনটি ভিডিও নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন হাসিব। মূলত ভিডিও কলের সময় ফেসবুকে সাইমার একটি লাইভ ভিডিওর ১৫ সেকেন্ডের অংশ ডিজিটালি পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৬ থানার বদলি-পদায়ন ও কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য
কমিশনারের গোপন ও আপত্তিকর ভিডিও হাতে আসার পরই শুরু হয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। সিএমপির অধীনস্থ ১৬টি থানার ওসি পদায়ন, গুরুত্বপূর্ণ বদলি ও তদবির কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে এই চক্র।
কমান্ড কন্ট্রোল দখল: কোন থানায় কে পোস্ট পাবেন কিংবা কাকে সরানো হবে-সব সিদ্ধান্ত হতো ওসি বাবুল, ওসি জাহেদুল ও জিয়ানের সমঝোতায়।
অফিস আদেশ জারি: পছন্দমতো তালিকা তৈরি করে জিয়ানকে দিয়ে কমিশনারকে ফোন দেওয়ানো হতো এবং ব্ল্যাকমেইলের ভয়ে সে অনুযায়ী জারি হতো অফিশিয়াল আদেশ।
আর্থিক সিন্ডিকেট: মামলা বাতিল, আসামি গ্রেপ্তার এড়ানো এবং বদলি বাণিজ্য পরিচালনার মাধ্যমে গত দেড় বছরে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা।
বিষয়টি চট্টগ্রাম পুলিশে দীর্ঘদিন ধরে ‘ওপেন সিক্রেট’ থাকলেও ভিডিও ফাঁসের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। হাসিব চট্টগ্রাম ছাড়ার পর একটি গোয়েন্দা টিম প্রতারক জিয়ানকে আটক করে তার মোবাইল ফোন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
সেখানে সাবেক কমিশনার হাসিব, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রভাবশালী পিয়ার আপত্তিকর ভিডিওসহ একাধিক হেভিওয়েট ব্যক্তির গোপন নথি উদ্ধার করা হয়।
ছায়া পরিচয়ের রহস্যময় নেটওয়ার্ক
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জিয়ান গত এক দশক ধরে চাটগাঁর ধনী পরিবারের মেয়ে, সাতকানিয়া বা বান্দরবানের প্রভাবশালী নারী, কিংবা এক সন্তানের জননী ও ডিভোর্সি নারী পরিচয়ে অন্তত ৫৪টি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে আসছিল।
তার মূল শিকার ছিলেন চট্টগ্রামের নামজাদা শিল্পপতি, শীর্ষ ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
২০২০ সালের ২৯ মে জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়ের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে তিনটি মোবাইল ও পাঁচটি সিমসহ সে গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে অধরা থেকে যায়।
অনুসন্ধানে ‘জান্নাতুল মনি’ ও ‘জান্নাতুন নাইমা’ নামে তার আরও দুটি সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে, যা দিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে প্রভাব বিস্তার করা হতো।
অভিযানে অদৃশ্য হাতের বাধা
জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ তার গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালালেও রহস্যজনকভাবে সাবেক এক মন্ত্রীর ফোন আসার পর অভিযানের গতি কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ফলে এই অপরাধচক্রের হোতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। সূত্র-আমার দেশ
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রতারককে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী আমার দেশকে জানান, বিষয়টির বিস্তারিত তার জানা নেই এবং সাবেক কমিশনারও কোনো অভিযোগ জানাননি। তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পদে বসে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া এবং পুরো নগরীর পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর সিএমপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনতিবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলার দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

