বাপের ক্ষমতায় এ প্লাস: চট্টগ্রাম বোর্ডে নম্বর জালিয়াতির রোমহর্ষক নথি ফাঁস!

সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথের ছেলে জালিয়াতিকাণ্ডের চার্জশিট জমা

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৪৭

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের অন্দরে বসে খোদ সচিবের নিজের সন্তানকে জিপিএ-৫ (এ প্লাস) পাইয়ে দেওয়ার এক নজিরবিহীন জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, নথি জালিয়াতি এবং অর্থমূল্যের বিনিময়ে পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে জিপিএ-৫ অর্জনের অভিযোগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পাঁচলাইশ থানা-পুলিশ।

তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম সফিউল আজম মুন্সীর পেশ করা এই অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে জালিয়াতির লোমহর্ষক সব চাঞ্চল্যকর তথ্য।

১৪ খাতায় নম্বরের ‘খৈ’: যেভাবে বাড়ল জিপিএ-৫
তদন্তে জব্দকৃত উত্তরপত্র, প্রাপ্ত নম্বরের মূল ফর্দ এবং তথ্য-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শেষে উঠে এসেছে যে, সচিবপুত্র নক্ষত্র দেবনাথের মোট ১৪টি পত্রের উত্তরপত্রে ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বাংলা প্রথম পত্র: লিখিত অংশে প্রকৃত নম্বর ছিল ৩১। সেখান থেকে কলমের এক টানে বাড়িয়ে করা হয় ৪১। নৈর্ব্যক্তিক অংশে ২৪ নম্বরের জায়গায় যোগ করা হয় আরও ২ নম্বর।

ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র: প্রথম পত্রের লিখিত অংশে পাওয়া ৭০ নম্বর এক লাফে গিয়ে ঠেকে ৯০-এ! সবচেয়ে বড় কারসাজি ঘটে দ্বিতীয় পত্রে-৫৮ নম্বরের জায়গায় একবারে ২৪ নম্বর বাড়িয়ে দেখানো হয় ৮১।

বিজ্ঞান বিভাগ: পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের লিখিত অংশে ৩৪ এর জায়গায় যোগ হয় ৮ নম্বর, দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকের নম্বর বাড়ানো হয়। রসায়ন প্রথম পত্রের লিখিত পরীক্ষায় ৩০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৪০, নৈর্ব্যক্তিকেও বাড়ে ৩ নম্বর।

রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে যোগ করা হয় বাড়তি ৪ নম্বর। বাদ যায়নি জীববিজ্ঞানও-প্রথম পত্রের লিখিত অংশে এক ধাক্কায় ১০ নম্বর বাড়িয়ে ৩৯ বানিয়ে দেওয়া হয়।

ভাতা দিয়ে আনা ‘জালিয়াতি কারিগর’
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই জালিয়াতিকে নিখুঁত রূপ দিতে অবসরকালীন ছুটিতে থাকা বোর্ডের সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খানকে অবৈধভাবে যুক্ত করা হয় ২০২৪ সালের ফলাফল প্রস্তুতের কাজে। চুক্তি অনুযায়ী তাকে দেওয়া হতো দৈনিক ২ হাজার টাকা ভাতা।

পুলিশ বলছে, নারায়ণ চন্দ্রনাথ নিজের পদের চরম অপব্যবহার করে এই কিবরিয়া মাসুদ খানের প্রত্যক্ষ কারিগরি সহায়তায় ছেলের খাতার আমূল পরিবর্তন ঘটান।

নিজের জালেই আটকা পড়ল পরিবার
২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয় গুঞ্জন। বিষয়টি ঢাকতে ও সাধারণ মানুষের সন্দেহ অন্যদিকে ঘোরাতে নক্ষত্রের মা বনশ্রী দেবনাথ নিজেই পাঁচলাইশ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যেখানে অভিযোগ তোলা হয় ‘কে বা কারা’ ফল পুনর্নিরীক্ষণের ভুয়া আবেদন করেছে। কিন্তু এই চাল উল্টো কাল হয়ে দাঁড়ায়। জিডির সূত্র ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের জুনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

পরবর্তী তদন্তে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলে নারায়ণ চন্দ্রনাথকে বোর্ড থেকে সরিয়ে মাউশির চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক করা হয় এবং পরে ওএসডি করা হয়। শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে সত্যতা মেলায় নক্ষত্রের ফলাফল বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ বাদী হয়ে মামলা ঠুকে দেন।

মামলার আসামিরা হলেন-নারায়ণ চন্দ্রনাথ (সাবেক সচিব, বর্তমানে জামিনে), নক্ষত্র দেবনাথ (সচিবপুত্র), কিবরিয়া মাসুদ খান (সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট) ও অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার (সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড)

পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনসহ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে।

একটি স্বনামধন্য শিক্ষা বোর্ডের সর্বোচ্চ পদে বসে সরকারি দায়িত্ব ও নৈতিকতার এমন চরম অবক্ষয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুঁশিয়ারি। আদালত চার্জশিট পর্যালোচনা করে পরবর্তী নির্দেশ দেবেন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি