চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজার ও নিউ মার্কেট এলাকা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, রাজনৈতিক উত্তাপের এক রক্তঝরা দিন। দিনদুপুরে হামলা, প্রকাশ্য মারধর, অস্ত্র প্রদর্শন আর চারপাশের গুলিবর্ষণে থমকে গিয়েছিল পুরো এলাকা।
সেই তাণ্ডবের ছায়ায় দায়ের করা হয় কোতোয়ালি থানার মামলা (এফআইআর নম্বর-৩১, জিআর নম্বর-৩৫৫-তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৪, সময়: বিকেল ৩টা ১০ মিনিট)।
দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩২৪, ৩০৭, ৩২৫, ৩২৬, ১০৯, ১১৪ ও ৩৪ ধারার মতো গুরুদণ্ডনীয় অভিযোগে ২৮৪ জন নামীয় এবং আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকা অনুসন্ধান করতেই বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় অধ্যায়-তালিকার ১৭৮ নম্বর আসামি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ আলম।
আইনের খাতায় যার নাম রয়েছে গুরুতর সব ধারায়, সেই সাজ্জাদ আলম এখন কোথায়? কেন তিনি এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে অনুপস্থিত, নাকি অদৃশ্য কোনো ক্ষমতার সুতোয় বন্দি পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া?
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের মতে, সাজ্জাদ আলম কেবল একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নন, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সমান দাপুটে।
অভিযোগ উঠেছে-৪ আগস্টের সহিংসতার সময় তার ভূমিকা ছিল সুপরিকল্পিত। কেবল সশরীরে উপস্থিতিই নয়, ওই দিনের তাণ্ডবে তার অর্থায়ন এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের গুরুতর তথ্য ভেসে উঠছে বাতাসে।
২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনে সহিংসতা ঘটনার জন্য ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেলের নির্দেশে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা নিরস্ত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি বর্ষন করেছেন বলেও ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র দাবি করেছেন।
তাছাড়া সহিংসতায় অস্ত্র গোলা বারুদ কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা ও অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ী সাজ্জাদ আলমের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে হাসিনা সরকারের সাবেক শিক্ষা মন্ত্রীর খুবই ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হওয়ার পরও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের ম্যানেজ করে এখনও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং তদন্তের বাইরে রয়েছেন।
ঘটনার আগে ও পরে তার সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড, আর্থিক লেনদেনের উৎস এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে গোপন ফোনালাপ খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
এদিকে সাজ্জাদকে ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতূহল ও আতঙ্ক। কেউ বলছেন তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বহাল তবিয়তে, আবার কেউ বা রটাচ্ছেন দেশত্যাগের গুঞ্জন।
যদিও তার দেশত্যাগের খবরের কোনো সরকারি বা দাপ্তরিক সত্যতা মেলেনি, ফলে একে সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়-যদি তিনি দেশেই থাকেন, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন তার অবস্থান স্পষ্ট করছে না? তবে কি কোনো অদৃশ্য শক্তির বলয় রক্ষা করে চলেছে তাকে?
অবশ্য আইনের মৌলিক নীতি বলছে, এজাহারে নাম থাকলেই কেউ অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হন না। বিচারিক প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে দোষ কিংবা নির্দোষের সীমা।
কিন্তু প্রশ্ন যেখানে জননিরাপত্তা ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার, সেখানে ১৭৮ নম্বর আসামি সাজ্জাদ আলমের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা আইনি বাধ্যবাধকতা।
রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যবসায়ের প্রভাব কি আইনের চেয়েও বড়? নাকি কোতোয়ালি থানার এই বহুল আলোচিত মামলায় ১৭৮ নম্বরের রহস্য উন্মোচনে নামবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?
উত্তর লুকিয়ে আছে নিরপেক্ষ তদন্ত আর সদিচ্ছার ওপর। অপরাধের চাদর যত ভারীই হোক, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একমাত্র পরীক্ষা।
অভিযোগের নানান বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেও ব্যাবসায়ী সাজ্জাদ আলমের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালে তিনি কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সহায়তায় সংবাদটি না করার জন্য নানাভাবে তদবির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

