চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র আগ্রাবাদ। এক কাঠা জমির দাম যেখানে আকাশছোঁয়া, সেখানে আইনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট আর সিডিএর অসাধু কর্মকর্তাদের অনৈতিক আশকারায় রাতারাতি বদলে গেছে এক টুকরো জমির মানচিত্র।
নথিপত্রে যা শুধুই ‘আধা-পাকা আবাসিক ঘর’, বাস্তবে তা বহুতল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চোখ ধাঁধানো নোটিশ আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাসের পর মাস আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার সালামি ও ভাড়া।
কিন্তু আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি রহস্যজনকভাবে নিরব। যে নিরবতার পেছনে জড়িয়ে আছে ভয়াবহ ঘুষ ও নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতির গন্ধ।
আবাসিক নকশার আড়ালে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য:
চউকের সদস্য-সচিবের কার্যালয় থেকে ইস্যু করা গৃহ নির্মাণ নথি নম্বর ১০৩৪/২০০০-২০০৫ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং পরবর্তী সংশোধনী আইনের আওতায় মৌজা-আগ্রাবাদ, থানা-ডবলমুরিং এলাকায় বিএস দাগ নম্বর ৯৭০৬ ও পিএস দাগ নম্বর ৪৩৯৪-এর পৌনে পাঁচ কাঠা জমিতে শুধুমাত্র একটি ‘আধা-পাকা আবাসিক ইমারত’ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
অনুমতিপত্রের স্পষ্ট নির্দেশ-অনুমোদিত নকশা হুবহু অনুসরণ করতে হবে, অন্যথায় তা আইনগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
কিন্তু বাস্তবতার রূপচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযুক্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জমির মালিক হাজী এয়াকুব আলী ভূঁইয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও তাঁর মেয়ে মোছাম্মৎ সামছুন নাহার বেগম অনুমোদিত আবাসিক নকশাকে ধূলিসাৎ করে সেখানে গড়ে তুলেছেন দুই তলা পাকা ইমারত।
আবাসিক ব্যবহারের শর্ত ভেঙে ভবনের নিচতলায় প্রকাণ্ড গোডাউন এবং রাস্তার পাশে সারি সারি বাণিজ্যিক দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।
কেবল আবাসন লঙ্ঘনই নয়, এসব অবৈধ দোকান বরাদ্দ দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকার অফেরতযোগ্য সালামি (অগ্রিম) এবং প্রতি মাসে পকেটে পুরছেন বিপুল অংকের বাণিজ্যিক ভাড়া।
নোটিশ শুধুই ‘আইনি লোকদেখানো’, নেপথ্যে লেনদেন?
আইন বহির্ভূত এই অনিয়ম চোখ এড়ায়নি চউকের। অথরাইজেশন কার্যালয় থেকে পর পর দুটি নোটিশ জারি করা হয়েছিল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল বছরের ২৭ অক্টোবর ও ৩০ নভেম্বর-দুই দফায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনের স্বাক্ষরে একটি জরুরি আইনি নোটিশ পাঠানো হয় অভিযুক্ত শামসুন নাহার ভূঁইয়ার নামে।
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ (সংশোধনী ১৯৮৭)-এর ১০(২) ধারা অনুযায়ী প্রেরিত ওই কারণ দর্শানো নোটিশে উল্লেখ করা হয়, নগরীর হালিশহর থানাধীন আগ্রাবাদ মৌজার আরএস দাগ নম্বর ১৪০০ (অংশ) এবং বিএস দাগ নম্বর ৯৭০৬ (অংশ) তফসিলভুক্ত জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক সরেজমিনে একাধিকবার পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে তিনি ইমারতটির অনুমোদিত নকশা প্রদর্শনের অনুরোধ জানালেও শামসুন নাহার ভূঁইয়া তা দেখাতে ব্যর্থ হন এবং তদন্ত কাজে কোনো প্রকার সহযোগিতা করা থেকেও বিরত থাকেন।
এমতাবস্থায়, নোটিশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে উক্ত ইমারতের বৈধ অনুমতিপত্র ও অনুমোদিত নকশা সরাসরি দপ্তরে দাখিল করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়।
নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নকশা দাখিলে ব্যর্থ হলে অননুমোদিত ইমারত নির্মাণের দায়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে চউক।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে এই নোটিশের অনুলিপি সংস্থার সংশ্লিষ্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখাতেও অনুলিপি হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই নোটিশের কোনো তোয়াক্কাই করেননি সামছুন নাহার বেগম ও তাঁর পরিবার।
প্রশ্ন উঠেছে, সিডিএর মতো একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশ এক সাধারণ ভবন মালিক কীভাবে বছরের পর বছর তুচ্ছজ্ঞান করে পার পেয়ে যাচ্ছেন?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চউকের সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক ও অথরাইজেশন শাখার কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি এবং অনৈতিক সুবিধার সমীকরণ।
একাধিক স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, নিয়মিত মোটা অঙ্কের ‘মাসিক নজরানা’ এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অথরাইজেশন কার্যালয় এই অবৈধ স্থাপনাটির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।
ফলে চউকের ফাইল চাপা পড়ে গেছে ঘুষের টাকার তলে, আর আইন ভাঙার এই মহোৎসব রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ প্রথায়।
যেসব আইনি কাঠামোর চরম লঙ্ঘন:
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮-এর সরাসরি ব্যত্যয় ঘটেছে এই ঘটনায়।
ধারা ৩(এ) লঙ্ঘন: অনুমোদিত ব্যবহারের বাইরে ভবন রূপান্তর করতে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। তা না করে আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যে রূপান্তর করায় সিডিএ তৎক্ষণাৎ তা বন্ধ বা উচ্ছেদের নির্দেশ দিতে বাধ্য।
ধারা ১২ অনুযায়ী শাস্তি: বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও সিডিএর বিধান লঙ্ঘনের জন্য আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
উচ্ছেদ ও খরচ আদায়: অথরাইজড অফিসার নোটিশের তোয়াক্কা না করলে নিজ দায়িত্বে স্থাপনাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই খরচ ভবন মালিকের কাছ থেকে আদায় করার এখতিয়ার রাখেন।
দায় এড়ানোর জঘন্য বাহানা:
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মোছাম্মৎ সামছুন নাহার বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত উদ্ধত কণ্ঠে গা বাঁচানোর চেষ্টা করে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা সিডিএর নিয়ম মেনেই ভবন করেছি।
তবে নকশার বাইরে কীভাবে দুই তলা বাণিজ্যিক ভবন ও গোডাউন তৈরি হলো-এই প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক গাফিলতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের মুখে চউকের অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেন দায়সারা। তাকে ফোন করে না পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করতে বার্তা পাঠালেও তিনি দুদিন ধরে কোন মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
একই বিষয়ে চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের সাথেও একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তার কোন মন্তব্য মেলেনি। এক্ষেত্রেও পরবর্তীতে তিনি মন্তব্য জানালে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
তবে নাম প্রকাশ না করা সর্তে সিডিএর অপর এক প্রকৌশলী বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়ে বলেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যে রূপান্তর করা এবং আইনি নোটিশ উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
এই প্রক্রিয়ায় যদি আমাদের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশ দেব।
কাগজে আধা-পাকা কিন্তু বাস্তবে দুই তলা বাণিজ্যিক ভবন-নগরপরিকল্পনার বুকে এই সস্তা কারসাজি অনিয়ম ছাড়াও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সততার মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত।
নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার এই তামাশা বন্ধ করে চউক কি পারবে নিজস্ব আইনে এই অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে? নাকি ঘুষের শক্তিশালী আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে আরও একটি আইনি অপরাধ?
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভবনটির অবৈধ অংশ অপসারণের দিকেই এখন তাকিয়ে সচেতন নগরবাসী।
উল্লেখ্য: ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে, বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ-মামলাবাজির নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং একাধিক মামলার অপরাধ জগতের চাঞ্চল্যকর কাহিনী”
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

