বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রতিটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার অলিগলিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল ইমারতগুলো যেন এখন একেকটি জীবন্ত ‘টাইম বোমা’।
বাহ্যিকভাবে আধুনিক ও নান্দনিক মনে হলেও, এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে চরম অনিয়ম আর নকশা জালিয়াতির এক ভয়াবহ ফাঁদ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এক পিঠটান দেওয়ার মতো সত্য। গত ১৫ বছরে নগরে নির্মিত প্রায় ৩০ হাজার ভবনের ৯৯ শতাংশই অনুমোদিত নকশার তোয়াক্কা না করে তৈরি করা হয়েছে।
তবে নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ চিত্র শুধু ভবনমালিকদের বেপরোয়া মানসিকতার ফল নয়, এটি মূলত সিডিএর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্নীতি, তদারকির নামে নীরব বাণিজ্য এবং অসাধু কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির এক প্রত্যক্ষ প্রতিফলন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত দেড় দশকে নগরজুড়ে চলেছে নকশা জালিয়াতির এক উন্মুক্ত মহোৎসব। যেখানে ৬ তলার অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, সেখানে চোখের সামনে উঠে গেছে ১০ তলা ভবন।
ভবনের চারপাশে নির্ধারিত ফাঁকা জায়গা (সেটব্যাক) রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নকশায় দেখানো পার্কিংয়ের স্থান রাতের আঁধারে বদলে গিয়ে পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক দোকান বা অতিরিক্ত ফ্ল্যাটে।
শুধু তাই নয়, সরকারি রাস্তা দখল, নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং নর্দমা ও প্রাকৃতিক খালের ওপর স্ল্যাব বসিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের মতো বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড চলেছে হরদম।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সিডিএর নাকের ডগায় কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ ইমারত গড়ে উঠল?
প্রতিটি ভবন নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে সিডিএর মাঠপর্যায়ের পরিদর্শকদের সনদ দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। টেবিলতলে আর্থিক লেনদেন আর প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্বের সুযোগে দিনের পর দিন তৈরি হয়েছে এই অনিয়মের পাহাড়।
নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলে বলেন, আইন ভঙ্গের তুলনায় শাস্তির মাত্রা অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় অনিয়মটিই এখানে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কার্যকর তদারকি এবং ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা না থাকলে আইন প্রয়োগের সুফল মিলবে না।
দীর্ঘদিনের তদারকি না থাকা ও নিয়মের তোয়াক্কা না করার বিষয়টি এখন স্বীকার করছে সিডিএও।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন সিডিএর এই ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে জানান, নির্ধারিত নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করায় নগরের পরিকল্পিত বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনুমোদিত নকশা ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত ভবনে ভবিষ্যতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক ইউটিলিটি সংযোগ বন্ধ করার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, নগরকে পুনর্গঠন ও বাসযোগ্য করতে স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণসহ বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, অনুমোদনহীন ও নকশাবহির্ভূত ভবন প্রতিরোধে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংস্থাটি আশা করছে, কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে পরিকল্পিত ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।(তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪)
তবে সচেতন নগরবাসীর মতে, শুধুমাত্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে কিংবা নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে সিডিএ নিজেদের ১৫ বছরের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে পারে না।
৩০ হাজার ভবনের মধ্যে ৯৯ শতাংশই যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তবে সিডিএর যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী উৎকোচের বিনিময়ে এসব ভবনে চোখ বুজে অনুমোদন দিয়েছেন, তাঁদের কেন আইনের আওতায় আনা হবে না?
ভূমিকম্প কিংবা বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডে এই নকশাবহির্ভূত ইমারতগুলো যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তখন সেই লাখো প্রাণের দায় কে নেবে?
চট্টগ্রামের মানুষকে এই নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে কেবল মুখের ঘোষণা নয়, বরং সিডিএর ভেতরের অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

