উচ্চ কিংবা নিম্ন আদালত-আইনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জামিনের স্পষ্ট নির্দেশ আসার পর নিয়ম মেনে জামিননামা পৌঁছায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের হাতে।
কারাবিধি ও দেশের সংবিধান অনুযায়ী জামিননামা পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্দিকে মুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে এক লাভজনক ব্যবসায়।
টাকা না দিলে জামিন মেলা বন্দির মুক্তির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, বিপরীতে অনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হলে সময় না গাতেই খুলে যায় জেলের লোহার ফটক।
গত দুই বছরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে জামিনপ্রাপ্তদের মুক্তি আটকে টাকা আদায়, পছন্দের ওয়ার্ড বরাদ্দ এবং স্বজনদের সাক্ষাতকে কেন্দ্র করে একের পর এক কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সকল অভিযোগের তীর ঘুরে ফিরে এসে পড়েছেন সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনের দিকে।
জামিন পেলেও মুক্তি মেলে না: ইলিয়াছ হোসেন ও মোহাম্মদ শফির ঘটনা
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও চকবাজার থানার একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি ও ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ হোসেনকে (২৫) জামিনের পর মুক্তি না দেওয়ার ঘটনায় চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কোতোয়ালি থানার একটি মামলায় গত ৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান ইলিয়াছ। গত বুধবার দুপুর ১২টায় জামিননামা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি পৌঁছায়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আইন অনুযায়ী তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট (পি-ডব্লিউ) বা পুরোনো কাস্টডি ওয়ারেন্ট (সি-ডব্লিউ) না থাকা সত্ত্বেও তাকে আটক রাখায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সরাসরি শোকজ নোটিশ জারি করেন।
চট্টগ্রামের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের কাছে লিখিত জবাব চেয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অনুরূপ এক ঘটনায় গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ও চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মানশ দাসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন, জেলার সাইয়েদ শাহ শরীফ, ডেপুটি জেলার মো. রাকিব শেখ ও তৌহিদুল ইসলামকে “ন্যায়বিচার দাবি নোটিশ” (Demand of Justice Notice) পাঠানো হয়।
রাউজান থানার বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বন্দি মোহাম্মদ শফি সেশন জজ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর চলতি বছরের গত ৫ এপ্রিল দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে জামিন বন্ড দাখিল করা হয়। সূত্র-এলসিবি
আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও কোনো ওয়ারেন্ট না থাকা সত্ত্বেও তাকে পরদিন ৬ এপ্রিল বিকেল ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২৫ ঘণ্টা অবৈধভাবে আটক রাখা হয়।
এরপর বিকেলে নতুন একটি মামলায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট পৌঁছালে তাকে পুনরায় আটকে দেখানো হয়, যা সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আদালত অবমাননার শামিল।
মুক্তি বাণিজ্য: ৫০ হাজার থেকে ৭ লাখ টাকার চুক্তি ও নতুন মামলার ভয়
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় দরকষাকষি। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও বিত্তশালী বন্দিদের লক্ষ্য করে একটি চক্র টাকা আদায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মামুন হত্যাচেষ্টা ও নতুন মামলায় আটক: ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে অস্ত্র মামলার আসামি তৌহিদুল ইসলাম মামুন জামিন পান।
অভিযোগ অনুযায়ী, জামিননামা পৌঁছানোর পর সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারকে ম্যানেজ করার কথা বলে ডেপুটি জেলার তৌহিদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।
ঘুষ না দেওয়ায় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তাকে আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে নতুন নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীর্ঘ ৩ দিন জামিন সত্ত্বেও ছেলেকে আটকে রাখার খবরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন মামুনের বাবা আইয়ুব আলী।
সাত লাখ টাকায় ছাত্রলীগ নেতা সায়েমের গোপন মুক্তি: ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিঃশব্দে মুক্তি পান সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ঘনিষ্ঠ ও নিষিদ্ধ সংগঠন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নির্বাহী সদস্য আবু সাদাত মো. সায়েম। সূত্র-সমকাল
অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের ৯ মাস পর সায়েমের এই বিতর্কিত মুক্তির জেরে ডেপুটি জেলার নওশাদ মিয়াকে স্ট্যান্ড রিলিজ/বদলি করা হলেও সিনিয়র কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান।
লাখ টাকায় ২ ঘণ্টায় মুক্তি: বাঁশখালীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ১ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনবার জেলগেটে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও জামিননামা পৌঁছানোর মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি পান। একইভাবে এক আইনজীবীও ১ লাখ টাকা বিনিময়ে ১ ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে বের হন।
গিয়াস উদ্দিন ও নাসির উদ্দিন রিয়াজের ঘটনা: মিরসরাইয়ের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিনের ৫টি মামলায় জামিন হওয়ার পর নতুন মামলায় না জড়ানোর শর্তে ৫ লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি।
অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়ার নাসির উদ্দিন রিয়াজের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া সত্ত্বেও কোতোয়ালি থানাকে ম্যানেজ করতে না পেরে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নতুন মামলায় (নং ৪০) গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং সংগৃহীত টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
অর্থের বিচারে ‘ওয়ার্ড ও সাক্ষাৎ বাণিজ্য’
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার যেন শ্রেণি বৈষম্যের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সেখানে সাধারণ বন্দিদের রাখা হয় টয়লেটের পাশের স্যাঁতসেঁতে ও গাদাগাদি ঘরে। অপরদিকে টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে মেলে বিশেষ সুবিধা।
ওয়ার্ড বাণিজ্য: ফ্যান, আলো-বাতাসযুক্ত ভালো ওয়ার্ডে থাকতে হলে দিতে হয় প্রতি মাসের নির্ধারিত টাকা। সাবেক বন্দিদের মতে, যমুনা-৮ নম্বর ওয়ার্ডকে অঘোষিত ‘আওয়ামী লীগ অফিস’ বানিয়ে রাখা হয়েছিল।
কারাগারের ভেতরে প্রভাবশালীদের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ, মোবাইল ফোন, বিশেষ ‘ফেরিওয়ালা’ ও অনুগত বন্দী। প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকা ‘ওয়ার্ড মাস্টার’ পদটিও এখন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে টাকার বিনিময়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। সূত্র-খো-কাগজ
কারা হাসপাতাল ও ভিআইপি আরাম: মোটা অঙ্কের বিনিময়ে হাসপাতালের বেড ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে রেস্টুরেন্টের খাবার, নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল ব্যবহারের সুবিধা মেলে, যা দেখতে অনেকটা পাঁচতারকা হোটেলের মতো।
সাক্ষাৎ ও পার্সেল বাণিজ্য: বন্দিদের স্বজনদের সাথে সাক্ষাতের নির্ধারিত অধিকারকেও ব্যবসায় রূপ দেওয়া হয়েছে।
ঘুষ না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও স্বজনরা ফিরে যান, আর টাকা দিলে অসংগঠিত সময়েও সরাসরি মিলছে সাক্ষাতের সুযোগ। এছাড়া বাইরে থেকে খাবার, ওষুধ ও পোশাক পাঠানোর প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে নির্দিষ্ট ঘুষের হার।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক দায় এড়ানো
বারংবার বিতর্ক ও আদালতের অসন্তোষ সত্ত্বেও সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন দায় এড়ানোর সুরেই কথা বলেছেন। গত বুধবারের শোকজের বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমে জানান, নথিপত্রে প্রযুক্তিগত বা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এমনটি হতে পারে এবং এতে কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, যাচাই-বাছাই বা জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে আসামিদের অবৈধভাবে আটকে রাখা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
গেল দুবছরের উল্লেখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনকে ফোন করে অনুমতি নিয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বেশ কিছু প্রশ্ন পাঠালেও দীর্ঘ সময়, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কোন মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনকে সিনিয়র তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পদায়ন করা হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিচারিক আদেশ অবমাননা, ঘুষ লেনদেন ও কারা প্রশাসনের অনিয়ম চরমে পৌঁছেছে।
আদালতের সুনির্দিষ্ট শোকজ ও আইনজীবীদের আইনি নোটিশের পর সচেতন মহলের প্রশ্ন-বিচার ব্যবস্থার প্রতি এই চরম অবজ্ঞা ও বন্দি হয়রানির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও উচ্চপদস্থ প্রশাসন কি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


