দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী হওয়ায় বান্দরবান সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিল্টন দস্তিদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
গত ৬ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এর আগে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ২৩ জুলাই আদালতের নির্দেশে তাঁকে চাঁদপুর কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই কারাভোগ করছেন।
আরও পড়ুন
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী বরখাস্ত থাকাকালীন তিনি কেবল প্রচলিত খোরপোষ ভাতা পাবেন। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি বর্তমান কর্মস্থল বা অন্য কোনো পদে যোগ দিতে পারবেন না।
বান্দরবান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফা সুলতানা খান হীরামণি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং উক্ত পদে নতুন একজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে।
পিআইও মিল্টন দস্তিদারের এই সাময়িক বরখাস্তের মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হয়েছে এক সরকারি কর্মকর্তার লাগামহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার থলে।
মাত্র ১০ বছরে অলৌকিক সম্পদ অর্জন
২০১২ সালে ফেনীতে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন পটিয়ার সন্তান মিল্টন দস্তিদার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তার মাত্র এক দশকের চাকরিতে অর্জিত সম্পত্তির চিত্র আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়।
তৎকালীন অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত দেব পাহাড় এলাকায় সিপিডিএল পারিজাত এপার্টমেন্টে প্রায় দেড় কোটি টাকায় ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট কিনে সেখানে অর্ধকোটি টাকা খরচ করে চোখধাঁধানো সাজসজ্জা করান তিনি।
নিজ গ্রাম পটিয়ার মধ্যম হাইদগাঁওয়ে গড়ে তোলেন দৃষ্টিনন্দন তিনতলা ভবন ‘অরণ্য নীড়’। পটিয়া বাইপাস এলাকা এবং চট্টগ্রাম নগরের একাধিক জায়গায় নিজের ও স্বজনদের নামে কিনেছেন বিপুল পরিমাণ জমি। কেবল তা-ই নয়, নিজ গ্রামে কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ১৮ শতক জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বজনদের নামে কোটি কোটি টাকার ডিপিএস ও এফডিআর
দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে, তিনি নিজে এবং স্ত্রী, বাবা, ভাই ও শ্যালক-শ্যালিকাদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস এবং এফডিআর খুলে রেখেছিলেন।
ন্যাশনাল ব্যাংক জুবলী রোড শাখা, ইউনিয়ন ব্যাংক সরকারহাট শাখা সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে ছিল এই অর্থ। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
নারী কেলেঙ্কারী ও অর্থ দিয়ে ধামাচাপার চেষ্টা
শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, নীতি-নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ডেও নাম জড়িয়েছে এই কর্মকর্তার। ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা ও অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে, যা চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানা পর্যন্ত গড়ায়।
পরবর্তীতে ব্যাংক কর্মকর্তা এক মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় থানায় মুচলেকা এবং ভুক্তভোগীকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি তড়িঘড়ি ধামাচাপা দেন তিনি।
তদবীর, অর্থ ঢালা ও বিচারিক পরিণতি
২০২১ সালে যখন দুদক তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, তখন থেকেই বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে ও অর্থ ঢেলে তদন্ত বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান মিল্টন।
স্থানীয় সাংবাদিক ও তদন্তকারী সংস্থাকে প্রভাবিত করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যবহার করার অভিযোগও ওঠে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।
২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দুদকের চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয় এবং পরবর্তীতে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে।
জনগণের দুর্যোগ মোকাবিলার অর্থ আত্মসাৎ করে এবং পদ-পদবির অপব্যবহার করে গড়ে তোলা এই অবৈধ সম্পদের পাহাড় শেষ পর্যন্ত মিল্টন দস্তিদারের রক্ষা করতে পারেনি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রশাসনের প্রত্যাশা, দুদকের মামলার মাধ্যমে তাঁর অর্জিত সব অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


