পতেঙ্গায় কৃষক দল নেতা আলমগীরের বহুমাত্রিক চাঁদার কোপ: একচ্ছত্র প্রভাব

বীচ থেকে বস্তি, ছাড় নেই কোথাও: দিশেহারা ব্যবসায়ী, নীরব প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:৪৪

ঘাট, হোটেল, জমি, মাছের প্রকল্প, কনটেইনার পরিবহন, টমটম ও সমুদ্রসৈকতের দোকান-বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ

চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকাটি এখন কার্যত এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী রাজত্বের কাছে জিম্মি। আর এই পুরো চাঁদাবাজি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর।

বাদাম বিক্রেতা, প্রান্তিক জেলে থেকে শুরু করে হেভিওয়েট ব্যবসায়ী-কাউকেই ছাড় দিচ্ছেন না তিনি। নদীঘাট, জমি, পর্যটন হোটেল, গণপরিবহন কিংবা সাগরের মাছ ধরার ফাঁড়-সবখানেই তার বিরুদ্ধে উঠছে একচ্ছত্র দখলাদারিত্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই পতেঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় এক আতঙ্কের নাম আলমগীর ও তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট।

আলমগীরের চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় মুখ্য সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তার দুই ভাই-স্বেচ্ছাসেবক দলের পতেঙ্গা থানা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম এবং পতেঙ্গা থানা ছাত্রদলের সভাপতি রাব্বী হোসেন রিমন।

স্থানীয়দের মতে, গত দুই বছরে বেপরোয়া দখলদারিত্ব ও চাঁদা আদায় করে রীতিমতো ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন এই নেতা। চড়ছেন বিলাসবহুল পাজেরো জিপে।

ঘাট দখল থেকে খেয়া পারাপারের অর্ধকোটি টাকা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পটপরিবর্তনের পরপরই আলমগীর সিন্ডিকেটের প্রথম নজর পড়ে পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর ১১ নম্বর খেয়া পারাপার ঘাটে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ইজারা নিয়ে খাস কালেকশনে নিয়োজিত মিজানুর রহমান ও তার কর্মীদের মারধর করে তাড়িয়ে ঘাটটি দখল করে নেয় আলমগীরের নিজস্ব বাহিনী।

সেখান থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা সরাসরি চলে যেত আলমগীরের পকেটে। প্রায় ছয় মাস অবৈধ দখলে রেখে প্রায় অর্ধকোটি টাকা পকেটস্থ করার পর, ইজারাদারের অভিযোগে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে আলমগীরের অনুসারীদের আটক করেন। পরবর্তীতে ঘাট ছেড়ে দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে অনুসারীদের ছাড়িয়ে আনেন এই কৃষক দল নেতা।

হোটেল-মোটেল ও পর্যটন খাতে জিম্মিদশা
পতেঙ্গা সৈকত ও নেভাল এলাকার অন্তত ১৬টি হোটেল থেকে এককালীন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং মাসে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা ধার্য করার মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হোটেলে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ব্যবসা রক্ষায় বরিশাল হোটেল, সমুদ্র বিলাস, সী-মুন, টানেল ভিউ, পতেঙ্গা টুডে, বীচ ভ্যালি’সহ অধিকাংশ হোটেল মালিক লাখ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন।

কেবল হোটেল খাত থেকেই আলমগীরের পকেটে গেছে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া পতেঙ্গা সৈকতের প্রায় ৪০০ ভাসমান ও স্থায়ী দোকান থেকেও নিয়মিত বিরতিতে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে।

জমি দখল ও ‘সাইনবোর্ড’ বাণিজ্য
টানেল রোডের মুখে চার একর জায়গার মালিক বনেদি ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের জমি ২ কোটি টাকায় ভাড়ার কথা বলে দখলে নেন আলমগীর। পরে মালিককে মাত্র ২০ লাখ টাকা দিয়ে বাকি টাকা না দিয়ে জমিটি তৃতীয় পক্ষের কাছে চড়া দামে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক রাশেদ আলীর দক্ষিণ পতেঙ্গার একটি জমিতে নিজের নাম লিখে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন আলমগীর। ঝামেলা এড়াতে ব্যবসায়ী রাশেদ পূবালী ব্যাংকের ১ লাখ টাকার একটি চেক পাঠান, যা ১৫ ডিসেম্বর (চেক নম্বর ০৯৩ ৩৬৮০) নগদায়ন করেন ছাত্রদল নেতা রাব্বি হোসেন রিমন।

পরবর্তীতে আবারও সেখানে ছাত্রদল নেতা রিমনের নাম লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নতুন করে চাঁদা দাবি করা হলে, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম সিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ আলী জানিয়েছেন, পুলিশ কমিশনারের দপ্তর থেকে আসা অভিযোগটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

বিষয়টা নিয়ে ছাত্রদল নেতা রাব্বি হোসেন রিমনের মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করা হলেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি।

ডিপো, মৎস্য খাত ও চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ
কাটগড় এলাকার ‘এসএপিএল’ ও ‘ওসিএল’ কনটেইনার ডিপো থেকে জোরপূর্বক বিনামূল্যে ১০টি সিরিয়াল বাগিয়ে নিয়ে তা ট্রাক ও লরি মালিকদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে আলমগীর সিন্ডিকেট।

বঙ্গোপসাগরের ইলিশ মৌসুমে জেলেদের চিহ্নিত ‘ফাঁড়’ এবং বিমানবাহিনীর ইজারাকৃত তিনটি মৎস্য প্রজেক্ট থেকে মূল অংশীদারদের ‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে প্রজেক্টের লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করে পকেটে পুরেছেন তারা।

এখানেই শেষ নয়, স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত ১২টার পর পতেঙ্গার উপকূলীয় পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা ইয়াবা, বিদেশি মদ, তেল ও সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেটগুলোকেও নিরাপত্তা ও ছাড়পত্রের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয় আলমগীরকে।

এছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটের প্রায় তিন হাজার টমটম ও এইচপাওয়ার গাড়ি থেকে গাড়িপ্রতি ভর্তি ফি ৩ হাজার টাকা এবং মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা হারে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম নগর কৃষক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীরের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন মন্তব্য করেন নি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে সংযোগ পাওয়া গেলে তিনি প্রতিবেদকের সাথে ইয়ার্কিসূলভ আচরণ করতে থাকেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি কোন ধরনের বক্তব্য স্পষ্ট করেননি।

তবে এর আগে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জাতীয় একটি দৈনিকে তিনি বলেছেন, বিগত সরকার আমলে আমি নির্যাতিত হয়েছি এবং ২৪ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতারও হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে জমি ও ঘাট দখলের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী রাশেদের জায়গাটি বিরোধপূর্ণ, তার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। কোনো কাজের সমালোচনা থাকতেই পারে, কিন্তু একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সূত্র-যুগান্তর

কর্ণফুলীর তীরের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় অধিবাসীদের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে এই বিশাল চাঁদাবাজি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি