৬১ জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে হাসান মাহমুদ কেন পিডি?-বাপাউবোয় তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:৪৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ, নদী পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা মোকাবিলার লক্ষ্যে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়েছে বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প।

সরকারি অর্থায়নে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদের এই মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।

তবে প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ শুরুর আগেই এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ।

গত ২৭ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে ফেনী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডি পদে পদায়ন করা হয়।

জনবল কাঠামো লঙ্ঘন, ৬১ জন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে অতিক্রম করা এবং অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধার সূত্রে এই বিতর্কিত নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

বাপাউবোর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, পদ্মা ব্যারেজের মতো মেগা প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী পিডি পদটি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত। অথচ বর্তমানে পদায়িত প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ চতুর্থ গ্রেডের (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) একজন কর্মকর্তা।

সিভিল ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬২ নম্বরে। অর্থাৎ তাঁর আগে ৬১ জন যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক বিধিমালা শিথিল করে তাঁকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোন প্রশাসনিক যুক্তিতে ও কার সুপারিশে জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে একজন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাকে এই পদে বসানো হলো-তা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নথি অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ বাপাউবো শাখার ২০২২-২৪ মেয়াদের গঠিত ৩৪ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটিতে ৩০ নম্বর সদস্য হিসেবে হাসান মাহমুদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তৎকালীন সরকারঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি টানা সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৭ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের সময়ও তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া ও মেধাক্রম নিয়ে অভ্যন্তরীণ অস্পষ্টতা বিদ্যমান।

প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের অতীতের কর্মস্থলগুলোতেও একাধিক অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির ছায়া রয়েছে:

বগুড়া মেয়াদ (২০১৭–২০১৯): নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ‘পারিশা ট্রেড সিস্টেম’ নামের একটি নতুন নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আরএফকিউ ও ডিপিএম প্রক্রিয়ায় কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

ভোলা মেয়াদ (২০১৯–২০২৪): ভোলা-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতায় প্রভাব বিস্তার এবং কাজ বণ্টনে ব্যাপক অনিয়মের খবর একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারি কাজ থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি বিভিন্ন উপায়ে দেশ-বিদেশে স্থানান্তরিত করেছেন।

তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারসহ ঢাকার বসিলা এলাকার মধু সিটিতে অবৈধ বিনিয়োগের তথ্যও চাউর রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির বেশ কিছু ফাইল অর্থ বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ পেন্ডিং রয়েছে।

সংস্থার একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, উত্তর অঞ্চলের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনিক কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনৈতিক আর্থিক সমঝোতা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দোহাই দিয়ে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রণালয় ও বাপাউবোর তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকাও এই প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

প্রকল্পটির সাফল্য ও সরকারি বিপুল অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল মনে করেন-নিয়োগের নোটশিট, ডিপিপি, এবং ডিপিএম নথি সার্বিক তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিতর্কিত কর্মকর্তার স্থলাভিষিক্ত করে জ্যেষ্ঠ ও নিষ্কলঙ্ক কোনো কর্মকর্তাকে এই দায়িত্ব প্রদান এবং নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনাই এখন সময়ের দাবি।

অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের বক্তব্য গ্রহণের চেষ্টা করা হলেও ফোন কিংবা বার্তা প্রেরণে তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি