কড়া প্রসংগ্রহ, সিসিটিভি ক্যামেরা আর ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কড়াকড়ির মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ৬৬৮ বেল ফেব্রিক্স (কাপড়) ভর্তি ৪০ ফুট লম্বা একটি বিশাল কনটেইনার।
কাস্টমস ও বন্দরের যাবতীয় শুল্ক ও রাজস্ব পরিশোধের পরও কনটেইনারের কোনো হদিস না মেলায় পুরো বন্দর ও পোশাক খাতে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
শতভাগ রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের অনুকূলে আমদানিকৃত কাঁচামালের এই বিশালাকার চালানটি গায়েব হয়ে যাওয়ায় বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি ট্র্যাকিং ব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সাভারের স্বনামধন্য পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ড স্টার গার্মেন্টস’-এর নামে বিদেশি কাঁচামালবাহী ‘এমআরএসইউ-৮৬৯২৮২৭’ নম্বরের ৪০ ফুটের এই কনটেইনারটি গত ১৫ আগস্ট ‘এমভি এমসিসি ডানাং’ জাহাজ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-২ বার্থে খালাস করা হয়।
এরপর আমদানিকারকের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ‘এসআরএস সিন্ডিকেট’ কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভারে গত ২২ আগস্ট বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৬০ লাখ টাকার রাজস্ব ও অন্যান্য ফি পরিশোধের পর কাস্টমস থেকে খালাসের চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়।
গত ৩০ আগস্ট আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি (CCT) ইয়ার্ডে কনটেইনারটি খালাস করতে গেলে বাঁধ সাধে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ইয়ার্ডে কনটেইনারটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করতে না পেরে তা খালাসে ব্যর্থ হয় বন্দর প্রশাসন।
অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে বন্দর কর্তৃপক্ষ উল্টো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকেই বন্দরের বিশাল ইয়ার্ডে নিজ দায়িত্বে কনটেইনারটি খুঁজে বের করার পরামর্শ দেয়।
৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা চার দিন তল্লাশি চালিয়েও সিসিটি ইয়ার্ড কিংবা বন্দরের অন্য কোনো স্থানে এই বিশালাকার কনটেইনারের কোনো সন্ধান মেলেনি।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ড স্টার গার্মেন্টস’-এর মালিক মো. হাফিজুর রহমান এ ঘটনায় চরম হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন।
তিনি জানান, শতভাগ রফতানিমুখী চালানের যাবতীয় শুল্ক ও সরকারি চার্জ যথাসময়ে পরিশোধ করা সত্ত্বেও এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কনটেইনার না পাওয়ায় তাদের প্রতিষ্ঠান ভয়াবহ আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।
নির্ধারিত সময়ে বিদেশ থেকে আনা কাপড়ের এই কাঁচামাল কারখানায় না পৌঁছালে সময়মতো তৈরি পোশাক রফতানি করা সম্ভব হবে না, যার ফলে বিদেশি বায়ারদের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকার রফতানি আদেশ বাতিলসহ বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের পক্ষ থেকে কনটেইনার না পাওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটির মূল রহস্য উদঘাটন, এটি চুরি হয়েছে নাকি ইয়ার্ডের কোথাও ভুলক্রমে পড়ে আছে-তা বের করতে বন্দরের অভ্যন্তরে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
একটি সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় বন্দর থেকে ডিজিটালি ট্র্যাক করা ৪০ ফুট লম্বা কনটেইনার রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়ার এ ঘটনায় বন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা কর্মী ও দায়িত্বরত কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা গুঞ্জন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, দ্রুত এই চালানের সন্ধান না মিললে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বন্দর ও তৈরি পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


