হাটহাজারীতে বায়না দলিলের আড়ালে সংখ্যালঘু ভিটে দখলের পাঁয়তারা

প্রভাবশালী সালাউদ্দীনের চোখ সুবীর পালদের ভিটেয়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:১৪

আদালতের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে, গ্রাম্য আদালতের সিদ্ধান্তও গেছে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে। কিন্তু কোনো কিছুরই পরোয়া করছেন না এলাকার প্রভাবশালী ও চতুর দখলদার হিসেবে পরিচিত এস এম সালাউদ্দীন।

জমি বিক্রির প্রাথমিক বায়না দলিলকেই ‘অস্ত্র’ বানিয়ে হাটহাজারীর ফতেয়াবাদে বহু বছরের পুরনো এক সংখ্যালঘু পরিবারের বসতভিটার জায়গা গ্রাস করার পাঁয়তারা চালানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ঘটনার বিবরণী ও থানায় দায়ের করা অভিযোগ থেকে জানা যায়, ফতেয়াবাদ পাল পাড়ার মন্টু পালের ছেলে সুবীর পাল (৫২) এবং তাঁদের প্রতিবেশি সাধন দাশ ও লক্ষণ দাশদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ১ শতক জমি নিয়ে সীমানা বিরোধ চলছিল।

সাধন ও লক্ষণ দাশদের ক্রয়কৃত মোট ৯ শতক জমির মধ্যে ৪ শতক তারা আগেই অন্যত্র বিক্রি করে দেন।

নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের অবশিষ্ট ৫ শতক জমিতে অবস্থান করার কথা থাকলেও, তারা সুবীর পালদের পৈতৃক ভিটার ১ শতক জমি জোরপূর্বক দখল করে চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।

আইনি লড়াইয়ে সুবিধা করতে না পেরে এবং বিজ্ঞ আদালত ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম্য আদালত সুবীর পালদের পক্ষে রায় দিলে, কৌশল পাল্টান সাধন ও লক্ষণ দাশ।

অভিযোগ উঠেছে, বিবাদের এই ১ শতক জমি সহ পুরো সম্পত্তি স্থানীয় সাউথ মাদার্শার প্রভাবশালী ব্যক্তি এস এম সালাউদ্দীনের কাছে বায়না সূত্রে হস্তান্তর করেন তারা। আর এই বায়না দলিল হাতে পাওয়ার পর থেকেই ঘটনার রূপ নেয় ভিন্ন মাত্রায়।

স্থানীয়দের মতে, এস এম সালাউদ্দীন মূলত চতুর ও ধারালো প্রকৃতির দখলবাজ। বিবাদের আইনি ভিত্তি দুর্বল জেনেও অপরের জমি নিজের সীমানায় তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামেন তিনি।

গত ২ সেপ্টেম্বর সকালে সালাউদ্দীন ও তাঁর সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিরোধপূর্ণ ওই ১ শতক জায়গায় জোরপূর্বক সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন।

ভুক্তভোগী সুবীর পাল বাধা দিতে গেলে সালাউদ্দীন ও তাঁর লোকজন মারমুখী হয়ে ওঠেন এবং পরিবারটিকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেন।

ভুক্তভোগী সুবীর পাল হতাশা ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, আমাদের পৈতৃক ভিটামাটি রক্ষা করতে গিয়ে আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

আদালত এবং ইউপি চেয়ারম্যানের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও সালাউদ্দীনের ক্ষমতার দাপটের কাছে আমরা অসহায়। যেকোনো সময় আমাদের পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলতে পারে।

ঘটনার পর ফতেয়াবাদ পাল পাড়ায় সংখ্যালঘু পরিবারটির মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুবীর পাল হাটহাজারী মডেল থানায় এস এম সালাউদ্দীন ও অপর দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এস এম সালাউদ্দীন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অসহায় মানুষের জমি দখলের চেষ্টা করছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এস এম সালাউদ্দীনের মুঠোফোনে না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও তিনি সেখানে লেখেন, জমি-সংক্রান্ত বিষয়টি সম্পূর্ণ কাগজপত্র ও সীমানা নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে।

ব্যক্তিগতভাবে সুবীর পালের পরিবারের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই এবং এ যাবতকাল উনাদের সাথে আমার কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা তো দূরের কথা, কথাও হয়নি-যদিও আমরা একই এলাকায় বসবাস করি।

আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে উনাদের কাছে সীমানা পরিমাপের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় উনাদের নির্ধারিত আগামী ১১ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে জায়গা পরিমাপ করার কথা রয়েছে। সম্প্রতি ওই পরিবারের সাথে আমার দেখা হয়েছে, উনারা পরিমাপের মাধ্যমে আমার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে ঘটনার বিষয়ে জানতে হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমানের কাছে ফোন করলেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি কোন মন্তব্য করলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির এভাবে সংখ্যালঘু পরিবারের জায়গা দখলের চেষ্টায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

তারা দ্রুত হাটহাজারী থানা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন, যাতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ভূমিদস্যুতার এই চেষ্টা নস্যাৎ হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারটি আইনের সঠিক সুরক্ষা পায়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি