রেলের ৮ ‘গায়েবি’ কর্মচারীর টাকা যাচ্ছে ভূতুড়ে সিন্ডিকেটে!

বাসায় বসে বেতন, বহিরাগতের হাতে অফিসিয়াল নথি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১৩

কাগজে-কলমে তারা কঠোর পরিশ্রম করছেন-কেউ পাহারা দিচ্ছেন আখাউড়া বাইপাস রেললাইন, আবার কেউ চব্বিশ ঘণ্টা সতর্ক প্রহরায় দিন কাটাচ্ছেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপ-সহকারী প্রকৌশলীর (ওয়ে) দপ্তরে।

কিন্তু বাস্তবে? এদের কোনো অস্তিত্বই নেই! ৮টি শূন্য পদের বিপরীতে বছরের পর বছর ধরে বেতন তুলে নিচ্ছে এক অদৃশ্য হাত।

এই ‘গায়েবি’ কর্মচারীদের নামে প্রতি বছর সরকারি কোষাগার থেকে লোপাট হয়ে যাচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশল দপ্তরের অধীন সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (আখাউড়া) কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল দুর্নীতির চেইন।

এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হানিফ পাশা এবং ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিব।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই অশুভ আঁতাতে আখাউড়া ও শায়েস্তাগঞ্জ প্রকৌশল বিভাগ এখন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভয়ারণ্য।

৩ বছরের গোপন নথি ও ‘ভূতুড়ে’ ৮ কর্মচারী

রেলের প্রকৌশল বিভাগে ‘অস্তিত্বহীন কর্মী’দের নামে বিল তৈরি করা এখন এক খোলা রহস্য (ওপেন সিক্রেট)। প্রতি মাসে অত্যন্ত গোপনে মাত্র এক দিনের মধ্যে এই গায়েবি কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুত করা হয়।

বিল পাস হওয়ার পরপরই নথিপত্র তালাবদ্ধ হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ড্রয়ারে। কর্মচারীরা জানলেও নথির হদিস পাওয়ার উপায় থাকে না।

আটজন ভুয়া কর্মচারীর মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে তিনজনের নাম।

১। মাহমুদুল হাসান: শায়েস্তাগঞ্জ পিডব্লিউআই দপ্তরে টিএলআর চৌকিদার হিসেবে বেতন নিচ্ছেন। অথচ বাস্তবে তিনি একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী, যার নিয়মিত হাজিরা রয়েছে শিক্ষাঙ্গনে। তিনি ওয়েম্যান ওসমান গনির ছেলে।

২। রুকন উদ্দীন ও আমীর হোসেন: আখাউড়া বাইপাস লাইনে টিএলআর কর্মী হিসেবে এদের নামে প্রতি মাসে ভুয়া বেতন প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বাকি পাঁচজনের টাকাও সরাসরি চলে যাচ্ছে প্রকৌশল বিভাগের সিন্ডিকেটের পকেটে।

নিয়মকানুন ও রেলওয়ে সার্ভিস রুলসের তোয়াক্কা না করে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক বাদল খানকে চাকরিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। চার মাসের বেশি কারাগারে থাকায় ছয় মাস ২০ দিন বরখাস্ত ছিলেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী যোগদানের পূর্বে বিভাগীয় তদন্ত, আইন শাখার মতামত এবং রেলওয়ে মেডিক্যাল সনদ (আরএমসি) নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তার কিছুই করা হয়নি।

রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এমআর মনজু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও যারা নিয়ম ভেঙে এভাবে বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শ্রমিক লীগ নেতাদের পুনর্বাসন করছে, তারা মূলত ফ্যাসিবাদেরই দোসর।

স্বজনপ্রীতি, নিয়মভাঙার খতিয়ান ও বন্দি সাধারণ শ্রমিক

অফিসিয়াল চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক কাঠামোর ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই আখাউড়া প্রকৌশল দপ্তরে।

জ্যেষ্ঠতা পিসিয়ে টাইমকিপারই ‘কর্তা’: স্থায়ী দুইজন সিনিয়র অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর থাকা সত্ত্বেও ব্লক পোস্ট টাইমকিপার ইসরাইল মিয়াকে দেওয়া হয়েছে উচ্চমান সহকারীর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া কোনো নথি ছাড়েন না ইসরাইল।

অনুমোদিত পদের বাইরে ডিউটি: চৌকিদার মতিউর রহমানকে দেওয়া হয়েছে ডেসপাসের কাজ, আর লিখিত কোনো আদেশ ছাড়াই ওয়েম্যান মামুনুর রশিদকে বানানো হয়েছে চৌকিদার।

বহিরাগতদের দাপট: আখাউড়া ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী দপ্তরের কর্মচারী না হয়েও ফরহাদ নামে এক বহিরাগত ব্যক্তি অফিসিয়াল নথি নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং সাধারণ কর্মচারীদের জিম্মি করে রাখছেন।

বাসায় বসে বেতন ও ঘুষ বাণিজ্য: কুলসুম বেগম নামে এক কর্মচারী কোনো কাজ না করেই বাসায় বসে মাস শেষে পুরো বেতন তুলে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে ওয়েম্যান ওসমান গনি গ্যাংয়ের কাজ না করে অফিসে বসে কল্যাণ ট্রাস্টের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের থেকে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করছেন।

অভিযোগের তীর যার দিকে, সেই সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (আখাউড়া) আবু হানিফ পাশা যথারীতি দায় এড়িয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। ঘরে বসে বেতন নেওয়ার কোনো ঘটনা আমার জানা নেই, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি।

বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবীবও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম অনিয়মের সত্যতা আংশিক স্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, শ্রমিক লীগ নেতা বাদলের যোগদান প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি। আরএমসি ও আইনি মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সকল অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র-এ এস

কাগজের পাতায় জ্যান্ত কিন্তু বাস্তবে অদৃশ্য-এমন কর্মীদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালছে রেলওয়ে।

নিরপেক্ষ ও বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে এই র্যা কেট ভেঙে ফেলা না হলে কেবল বেতন-ভাতার লোপাটই নয়, রেলের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি